খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের পূর্বাভাস দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, এই চুক্তির ফলে কেবল চলতি অর্থবছরেই সরকারের শুল্ক রাজস্বে প্রায় ১,৩২৭ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হতে পারে। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সুপারিশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন জানান, এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত প্রায় ৪,৫০০টি পণ্যে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করতে হবে। এছাড়া আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও ২,২১০টি পণ্যে পর্যায়ক্রমে শুল্ক ছাড়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সিপিডি মনে করছে, এই চুক্তিটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ (MFN) নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। যদি অন্য কোনো সদস্য দেশ একই সুবিধার দাবি তোলে, তবে বাংলাদেশকে তাদেরও শুল্ক ছাড় দিতে হবে, যা দেশের রাজস্ব কাঠামোকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
নিচে চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব ও রাজস্ব পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ/উপাত্ত |
| তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত পণ্য | ৪,৫০০টি (যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত) |
| দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক ছাড়ের পণ্য | ২,২১০টি (আগামী ৫-১০ বছরে) |
| সম্ভাব্য রাজস্ব হারানো (চলতি বছর) | ১,৩২৭ কোটি টাকা |
| রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা (প্রবৃদ্ধি) | ৩৪.৫% |
| প্রকৃত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি (জানুয়ারি পর্যন্ত) | ১২.৯% |
| বর্তমান রাজস্ব ঘাটতি | প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা |
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে বাণিজ্যকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বেসরকারি খাত কেন বিশেষ কোনো দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে আগ্রহী হবে যদি না সেখানে বিশেষ ভর্তুকি থাকে? এছাড়া নির্দিষ্ট দেশ থেকে পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতা দেশের ক্রয় ক্ষমতার সার্বভৌমত্বকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তিনি এই চুক্তির বিস্তারিত ধারাগুলো জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানান।
রাজস্ব আদায়ের মন্থর গতির কারণে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৫৯,৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহকে সংকুচিত করছে। এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের উপরে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হলে এই মূল্যস্ফীতি আরও লাগামহীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৈঠকে জানানো হয়, চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০.৩%, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। রপ্তানি আয় ৩.২% হ্রাস পাওয়া এবং আমদানি ৩.৯% বৃদ্ধি পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
পরিশেষে, সিপিডি পরামর্শ দিয়েছে যে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে অবাস্তব উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ত্যাগ করে বাস্তবসম্মত সংস্কারের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। বিশেষ করে কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৬.৮% থেকে বাড়িয়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৫% এ নিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক ও কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।