খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আসন্ন ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ আয়োজনের সময়সূচি নিয়ে বাংলা একাডেমি এবং দেশের সৃজনশীল প্রকাশকদের মধ্যে চরম মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। একাডেমির পক্ষ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরুর ঘোষণা দেওয়া হলেও, দেশের প্রায় তিন শতাধিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের দাবি, পবিত্র রমজান মাস এবং জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে মেলা অবশ্যই ঈদুল ফিতরের পরে আয়োজন করতে হবে। রোববার বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর এই সংক্রান্ত একটি লিখিত আবেদন পেশ করেছেন প্রকাশকরা।
প্রকাশকদের মতে, ফেব্রুয়ারি মাসে মেলা শুরু করা বর্তমান বাস্তবতায় একটি ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ এবং ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত। এর পেছনে তারা বেশ কিছু জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। প্রথমত, ২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু হলে মেলার একটি বড় অংশ পড়বে পবিত্র রমজান মাসের মধ্যে। রোজার সময় যানজট ও গরমের কারণে মেলায় পাঠক উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, মেলার স্টলগুলোতে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খণ্ডকালীন কাজ করেন। রোজা রেখে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন এবং ইফতার ও তারাবির সময় ডিউটি করানো মানবিক দিক থেকে কষ্টসাধ্য।
নিচে মেলা পেছানোর দাবির স্বপক্ষে প্রকাশকদের যুক্তি ও একাডেমির অবস্থানের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
টেবিল: ফেব্রুয়ারি বনাম ঈদের পর বইমেলা সংক্রান্ত বিতর্ক
| আলোচনার বিষয় | ফেব্রুয়ারিতে মেলা (বাংলা একাডেমির অবস্থান) | ঈদের পর মেলা (প্রকাশকদের দাবি ও যুক্তি) |
| আবহাওয়া | এপ্রিল মাসে কালবৈশাখী ও ঝড়-বৃষ্টির ঝুঁকি। | প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মেনে নিতে রাজি। |
| পাঠক উপস্থিতি | প্রথাগত ফেব্রুয়ারি মাসেই পাঠক সমাগম বেশি হয়। | রমজান ও নির্বাচনের কারণে পাঠক উপস্থিতি হ্রাস পাবে। |
| অর্থনৈতিক দিক | রুটিন অনুযায়ী আয়োজন করলে প্রশাসনিক সুবিধা। | গত দেড় বছরের মন্দার পর লোকসানের ঝুঁকি নিতে নারাজ। |
| মানবিক দিক | সরকারি সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন। | রোজা রাখা কর্মীদের জন্য দায়িত্ব পালন অত্যন্ত কষ্টকর। |
| অংশগ্রহণ | সকল প্রকাশককে অংশ নিতে আহ্বান। | দাবি না মানলে মেলা বর্জনের হুঁশিয়ারি। |
প্রকাশক নেতারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, গত ১৮ মাস ধরে প্রকাশনা শিল্প এক চরম অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাগজের উচ্চমূল্য এবং মুদ্রণ খরচ বৃদ্ধির ফলে সৃজনশীল বইয়ের বাজার সংকুচিত হয়েছে। এই অবস্থায় যদি রমজানের মধ্যে লোকসান হয়, তবে অনেক মাঝারি ও ছোট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। তারা বাংলা একাডেমিকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এর আগেও বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন করোনার সময়) ফেব্রুয়ারি মাসের বাইরে বইমেলা আয়োজনের সফল নজির রয়েছে।
লিখিত আবেদনে প্রকাশকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি তাদের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে জোরপূর্বক মেলা শুরু করা হয়, তবে তারা এই মেলায় অংশগ্রহণ করবেন না। তারা মনে করেন, পাঠকহীন মেলা কেবল প্রকাশকদের নয়, বরং আয়োজক হিসেবে বাংলা একাডেমির জন্যও বিব্রতকর হবে।
বইমেলা কেবল একটি বই বিক্রির বাজার নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রাণের উৎসব। প্রকাশকদের দাবি—যদি ঈদুল ফিতরের পর উৎসবমুখর পরিবেশে মেলা আয়োজন করা হয়, তবে পাঠকরা যেমন স্বাচ্ছন্দ্যে বই কিনতে পারবেন, তেমনি প্রকাশকরাও ব্যবসায়িকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন। এখন দেখার বিষয়, সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এবং বাংলা একাডেমি তিন শতাধিক প্রকাশকের এই গণদাবি বিবেচনা করে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় কি না। প্রকাশনা শিল্পের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে একটি ‘সফল’ মেলার কোনো বিকল্প নেই।