গ্যাসের সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। কোথাও একটানা, কোথাও আবার কয়েক দফায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় প্রচণ্ড গরমের মধ্যে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট রাত থেকে ২০ আগস্ট রাত পর্যন্ত দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি ছিল। ১৯ আগস্ট রাত ৯টায় সর্বোচ্চ ২ হাজার ২৬৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং দিয়ে পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়। রাত ১০টায় ঘাটতি ছিল ১ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট, রাত ১১টায় ১ হাজার ১৭৯ মেগাওয়াট এবং মধ্যরাতে ১ হাজার ১৩৮ মেগাওয়াট।
রাত বাড়ার সঙ্গে কিছুটা কমে আসে ঘাটতি। রাত ১টায় লোডশেডিং ছিল ৯১২ মেগাওয়াট এবং রাত ২টায় তা নেমে আসে ৬৯৬ মেগাওয়াটে। তবে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর আবারও বিদ্যুতের ঘাটতি বাড়তে থাকে। দুপুর ২টায় ১ হাজার ১৩৮ মেগাওয়াট, বিকেল ৩টায় ১ হাজার ৭৭৪ মেগাওয়াট, বিকেল ৪টায় ১ হাজার ৩৯৯ মেগাওয়াট এবং বিকেল ৫টায় ১ হাজার ২৯৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। রাত ৮টার দিকে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৯৮ মেগাওয়াটে।
সরকারি হিসাবে যে পরিমাণ ঘাটতির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতায় বাস্তব পরিস্থিতি আরও কঠিন। অনেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের বাইরে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
গরমে অতিষ্ঠ নগরবাসী
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশু, বয়স্ক মানুষ ও কর্মজীবীরা। শান্তিনগরের বাসিন্দা মনিকা সুলতানা বলেন, সারাদিন প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বাসায় শিশু ও বয়স্ক মানুষ থাকায় পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কখন বিদ্যুৎ চলে যাবে আর কখন ফিরে আসবে, তারও কোনো নির্দিষ্টতা নেই।
মধুবাগের বাসিন্দা মন্ময় মিত্র জানান, সন্ধ্যার পর কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে গেছে। রাতে ঘুমানোর সময়ও বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে বিশ্রাম নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে সকালে অফিসে যেতে হওয়ায় এই পরিস্থিতি কর্মজীবী মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তাঁর ভাষ্য, কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমস্যা আরও বেড়েছে।
পল্টনের বাসিন্দা রোজিনা বেগমের অভিজ্ঞতাও একই। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রিজ, বৈদ্যুতিক পাখা ও পানির পাম্প ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। গ্যাস না থাকায় ভাত রান্নার জন্য বৈদ্যুতিক রাইস কুকার ব্যবহার করতে গেলেও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আবার পানি তোলার জন্য পাম্প চালু করলেই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। ফলে একই সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুই সংকট সামলাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
গ্যাসের সরবরাহ কমায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতির পেছনে গ্যাসের সংকটকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত সোমবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পাওয়া গ্যাসের পরিমাণ ছিল ৯৩১ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট।
এরপর এক্সিলারেট এনার্জির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। বুধবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের সরবরাহ কমে ৮৯২ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে।
জাতীয় পর্যায়েও বড় গ্যাস ঘাটতি
দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু ২০ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টার হিসাবে জাতীয় পর্যায়ে মোট সরবরাহ ছিল ২ হাজার ১৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে এসেছে ১ হাজার ৬২৬ মিলিয়ন ঘনফুট এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এই ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহই এসেছে সামিটের টার্মিনাল থেকে। কার্গো সংকটের কারণে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে দৈনিক চাহিদার তুলনায় জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০৪ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ মোট চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনেও চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। আর উৎপাদন ও সরবরাহের এই ঘাটতি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় লোডশেডিংয়ের চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; রান্না, পানি সরবরাহ, গৃহস্থালির কাজ এবং দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে।


