শরীয়তপুরের জাজিরায় এক শিশুকে বলাৎকারের মতো বিভৎস অপরাধের পর তা আইনের হাতে না সোপর্দ করে স্থানীয়ভাবে রফা-দፋ করার এক ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নে ঘটেছে এই কান্ড। অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম ইলিয়াস খান (৫০)। তবে ঘটনাটি সামনে আসার চেয়েও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ— স্থানীয় এক জামায়াত নেতা ও এলাকার মাতব্বরদের প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় মাত্র ১ লাখ টাকার বিনিময়ে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ৬ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে জয়নগর আয়তুন্নেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলায় ভুক্তভোগী শিশুটিকে (১২) ফুসলিয়ে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়ে যান অভিযুক্ত ইলিয়াস খান। সেখানে নির্জনতার সুযোগ নিয়ে তিনি শিশুটির ওপর অমানবিক নির্যাতন চালান। পরবর্তী সময়ে শিশুটি বাড়ি ফিরে স্বজনদের বিস্তারিত জানালে তা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু ন্যায়বিচারের স্বার্থে আইনের আশ্রয় নেওয়ার বদলে শুরু হয় অন্য হিসাব-নিকাশ। স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ঘটনা জানাজানি হতেই স্থানীয় জামায়াত নেতা মাওলানা মো. সেলিম এবং মান্নান শিকদারের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী মহল বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার তৎপরতা শুরু করে। প্রথম দিকে ভুক্তভোগীর বাবা কিছুতেই এই অন্যায়ে আপস করতে চাননি; তিনি অনড় ছিলেন অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে। তবে একের পর এক বৈঠক ও সামাজিক চাপ তৈরি করে তাকে কাবু করার চেষ্টা চলে।
অবশেষে ১২ আগস্ট বুধবার সন্ধ্যায় জয়নগর মোসলেম উদ্দিন খান ডিগ্রি কলেজ মাঠে বসে বহুল আলোচিত সেই সালিশ বৈঠক। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মাতব্বরদের উপস্থিতিতে ভুক্তভোগী শিশুর বাবার হাতে তুলে দেওয়া হয় নগদ ১ লাখ টাকা। বিনিময়ে কোনো মামলা-মোকদ্দমা করা যাবে না— এমন শর্ত সম্বলিত একটি লিখিত কাগজে জোরপূর্বক তার স্বাক্ষর আদায় করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিজের অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে ভুক্তভোগী শিশুর বাবা বলেন, “আমি কোনো টাকা বা আর্থিক আপস চাইনি, চেয়েছিলাম আমার সন্তানের সাথে ঘটে যাওয়া অপরাধের সঠিক বিচার। কিন্তু স্থানীয় মাতব্বর আর আত্মীয়স্বজনের ক্রমাগত মানসিক চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে ওই এক লাখ টাকার বিনিময়ে কাগজে সই দিতে হয়েছে।”
শিশু নির্যাতনের মতো একটি গুরুতর ফৌজদারি ও জঘন্য অপরাধ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে না জানিয়ে অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনায় জাজিরার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এলাকার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, টাকার বিনিময়ে যদি এমন অপরাধ পার পেয়ে যায়, তবে সমাজে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কেবল বাড়তেই থাকবে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে সালিশের অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী জামায়াত নেতা মাওলানা মো. সেলিম দায় এড়ানোর সুরে জানান, তিনি একাকী এই সিদ্ধান্ত নেননি। তার দাবি, এলাকায় ইলিয়াস খান একজন ‘সম্মানিত ব্যক্তি’ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ একজোট হয়ে সামাজিক সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থেই সমাধানের চেষ্টা করেছেন। এদিকে সালিশের আরেক আয়োজক মান্নান শিকদারের বাসায় একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পুরো বিষয়টি ইতোমধ্যে পুলিশ প্রশাসনের নজরে এসেছে। জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহমেদ জানান, ঘটনার বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ বা এজাহার তাদের হাতে পৌঁছেনি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন মৌখিক তথ্যের ভিত্তিতে তারা ইতোমধ্যে একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছেন। তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা মিললে অভিযুক্ত ইলিয়াস খানসহ আইনি প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
মন্তব্য