খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং বীর সন্তানদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ভাতার হার ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। রবিবার (২৫ জানুয়ারি, ২০২৬) সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ৩২তম সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমদ। সরকারের এই নতুন পদক্ষেপে মুক্তিযোদ্ধা, বিধবা, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধীসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সভার গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মাসিক ভাতার হার ৫ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগে এই পরিবারগুলো মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পেতেন, যা এখন থেকে ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত হলো। এছাড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহতদের মাসিক সম্মানি ভাতাকে এই কমিটির কার্যপরিধিভুক্ত করা হবে। এর ফলে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও টেকসই আর্থিক সহায়তার পথ প্রশস্ত হলো।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রধান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ভাতার হার:
| কর্মসূচির নাম | উপকারভোগীর সংখ্যা | বর্তমান ভাতার হার (মাসিক/এককালীন) |
| শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার | সংশ্লিষ্ট সকল পরিবার | ২৫,০০০ টাকা (৫,০০০ টাকা বৃদ্ধি) |
| বয়স্ক ভাতা | ৬২ লাখ জন | ৭০০ টাকা (৯০ ঊর্ধ্বদের জন্য ১০০০ টাকা) |
| বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা | ২৯ লাখ জন | ৭০০ টাকা (৯০ ঊর্ধ্বদের জন্য ১০০০ টাকা) |
| প্রতিবন্ধী ভাতা | ৩৬ লাখ জন | ৯০০ টাকা (বিশেষ ক্ষেত্রে ১০০০ টাকা) |
| মা ও শিশু সহায়তা | ১৮.৯৫ লাখ জন | ৮৫০ টাকা |
| অনগ্রসর জনগোষ্ঠী | ২.২৮ লাখ জন | ৭০০ টাকা |
| জটিল রোগীদের সহায়তা | ৬৫ হাজার জন | ১ লাখ টাকা (এককালীন) |
সভায় বয়স্ক ভাতা এবং বিধবা ভাতার ক্ষেত্রে বয়সের ভিত্তিতে নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। বয়স্ক ভাতা কার্যক্রমের উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ বাড়িয়ে ৬২ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৫৯ লাখ ৯৫ হাজার জন মাসিক ৭০০ টাকা করে পাবেন। তবে ৯০ বছরের ঊর্ধ্ব ২ লাখ ৫ হাজার প্রবীণ নাগরিক এখন থেকে মাসিক ১০০০ টাকা হারে ভাতা পাবেন। অনুরূপভাবে, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের ক্ষেত্রেও ৯০ বছরের ঊর্ধ্বের উপকারভোগীরা মাসিক ১০০০ টাকা ভাতা পাবেন।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণেও বিশেষ নজর দিয়েছে সরকার। বর্তমানে ভাতা পাওয়া প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৩৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩৬ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক বৃত্তির হার ৫০ টাকা করে বাড়িয়ে প্রাথমিক থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত ৯৫০ টাকা থেকে ১৩৫০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্যান্সার, কিডনি, লিভার-সিরোসিস এবং থ্যালাসেমিয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এককালীন আর্থিক সহায়তার পরিমাণ এক লাফে দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগে এই রোগীরা ৫০ হাজার টাকা পেতেন, যা এখন ১ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। পাশাপাশি উপকারভোগীর সংখ্যাও ৫ হাজার বাড়িয়ে ৬৫ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’র সুবিধাভোগী পরিবারের সংখ্যা ৫ লাখ বাড়িয়ে ৬০ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি পরিবার ১৫ টাকা কেজি দরে মাসে ৩০ কেজি করে খাদ্যশস্য সহায়তা পাবেন। অন্যদিকে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় মোট ১৫ লাখ জেলেকে ভিজিএফ (VGF) কর্মসূচির অধীনে আনা হয়েছে, যার মধ্যে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন।
অর্থ উপদেষ্টার নেতৃত্বে গৃহীত এই সিদ্ধান্তগুলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির এই সময়ে প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে এই বাড়তি বরাদ্দ একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিবারকে এই কাঠামোর আওতায় আনার সুপারিশ সরকারের দায়বদ্ধতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরই বহিঃপ্রকাশ।