এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: ২৭ই জুলাই ২০২৫, ৮:৫৫ এএম
পেশায় ব্যাংক কর্মকর্তা হলেও, প্রকৃত পরিচয় তিনি গড়ে তুলেছেন অভিনয়, আবৃত্তি, নির্দেশনা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নিরলস যোদ্ধা হিসেবে। তিনি আমাদের গর্ব, এক বহুমাত্রিক প্রতিভার নাম — সৈয়দ হাসান ইমাম।
১৯৩৫ সালের ২৭ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশবে শুরু হয় তার শিক্ষা বর্ধমান টাউন স্কুলে, পরে রাজ কলেজ ও টেকনিক্যাল কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৫২ সালে অল ইন্ডিয়া ইয়ুথ ফেস্টিভালে রবীন্দ্রসংগীতে প্রথম স্থান অর্জন করেন, যা তাঁর সাংস্কৃতিক পথচলার প্রথম দীপ্ত পদক্ষেপ।
১৯৫৫ সালে কলেজের মঞ্চে গান গেয়ে তিনি আকৃষ্ট করেন কিংবদন্তি দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়কে, যিনি তাঁকে নিজে হাতে গান শেখাতে চান। এরপর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসে তিনি চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৬০ সালে, আর ১৯৬৪ সাল থেকে শুরু হয় তাঁর টেলিভিশন যাত্রা।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে— ফির মিলেঙ্গে, ভাগ্যচক্র, রাজা এলো শহরে, শীত বিকেল, জানাজানি, ধারাপাত প্রভৃতি। ১৯৬৫ সালে ‘অনেক দিনের চেনা’ ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি সমগ্র পাকিস্তানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান লাভ করেন।
রবীন্দ্র শতবর্ষে ‘রক্তকরবী’, ‘তাসের দেশ’, ‘রাজা ও রানী’ নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি মঞ্চেও অনন্য হয়ে ওঠেন। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের উত্তাল সময়ে বাংলা একাডেমির বটমূলে ১০ হাজার মানুষের সামনে ‘রক্তকরবী’ নাটক পরিচালনা করে জাতিকে এক অসামান্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা উপহার দেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তিনি ছিলেন ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’-এর আহ্বায়ক, পাকিস্তান সরকারের প্রচারমাধ্যম বর্জন করেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগরে গিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’-এর নাট্য বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ‘সালেহ আহমেদ’ ছদ্মনামে সংবাদ পাঠ করেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তাঁর কৃতিত্বের ঝুলিতে রয়েছে:
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও নির্মাতা)
বাচসাস পুরস্কার
মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য ‘সিকোয়েন্স পুরস্কার’
সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক
টেলিভিশন নাট্যকার ও শিল্পী সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি ৩৮ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন উদীচী, নাট্যশিল্পী সংসদসহ বহু সংগঠনে।
আজ এই বিশেষ দিনে, আমরা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করছি তাঁর অবদান, সংগ্রাম ও সাধনার ইতিহাস।
শুভ জন্মদিন, সৈয়দ হাসান ইমাম!
আপনার সৃজনশীলতা, আদর্শ ও সংগ্রামী চেতনা আমাদের পথ দেখাক চিরকাল। রইল নিখাদ শ্রদ্ধা, আন্তরিক শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা
মন্তব্য