সাবেক মিস সুইজারল্যান্ডের ধর্ষণের অভিযোগ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছেন সাবেক মডেল ও মিস সুইজারল্যান্ড বিয়াত্রিস কিউল। তাঁর দাবি, ১৯৯৩ সালে নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে ট্রাম্প তাঁকে ধর্ষণ করেছিলেন। এর আগে ২০২৪ সালে একই ঘটনার বিষয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। তবে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

সোমবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের একটি প্রতিবেদনে কিউলের অভিযোগসহ ট্রাম্পের সঙ্গে যৌন অপরাধে অভিযুক্ত জেফরি এপস্টেইনের কথিত সম্পর্ক এবং এপস্টেইনের অপরাধের সঙ্গে ট্রাম্পের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্তের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে কিউল অভিযোগ করেছিলেন, ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে প্লাজা হোটেলে ট্রাম্প তাঁকে যৌন হয়রানি করেছিলেন। তবে ডেমোক্র্যাট কমিটির কর্মীদের সঙ্গে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, ওই ঘটনায় তাঁকে ধর্ষণও করা হয়েছিল।

কিউলের অভিযোগের বিষয়ে হোয়াইট হাউস কঠোরভাবে আপত্তি জানিয়েছে। ট্রাম্পের একজন মুখপাত্র এসব অভিযোগকে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, প্রেসিডেন্টের সাফল্য এবং রিপাবলিকানদের প্রতি বাড়তে থাকা সমর্থন থেকে মার্কিন নাগরিকদের মনোযোগ সরাতেই এ ধরনের অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।

প্লাজা হোটেলে পরিচয়, ভিসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিশ্রুতি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাট কমিটির কর্মীদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরে সাক্ষাৎকারে কিউল তাঁর অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে তাঁর বয়স ছিল ২৪ বছর। নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতাসংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সে সময় হোটেলটির মালিক ছিলেন ট্রাম্প।

কিউলের দাবি, পরিচয়ের সময় ট্রাম্প তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে (এনওয়াইইউ) ভর্তির সুযোগ করে দিতে পারবেন বলেও জানিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি তোমার দেখভাল করব।’

কিউলের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন শেষ হওয়ার পরপরই এপস্টেইন তাঁর কাছে আসেন। এপস্টেইন নিজেকে ট্রাম্পের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন এবং তাঁকে মার-আ-লাগোতে একটি পার্টিতে আমন্ত্রণ জানান। প্রতিবেদনে এপস্টেইনের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁরা নিয়মিত বিভিন্ন পার্টির আয়োজন করতেন।

এপস্টেইনের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হওয়ার অনেক আগেই তাঁদের বন্ধুত্বের অবসান হয়েছিল। ট্রাম্প এপস্টেইনকে বিভিন্ন সময়ে ‘বিকৃত রুচির লোক’ বলে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে দাবি করেছেন, তাঁকে মার-আ-লাগো ক্লাব থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।

ধর্ষণের অভিযোগে নতুন বিবরণ

ডেমোক্র্যাটদের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্লাজা হোটেলে পরিচয়ের পর ট্রাম্পের একজন প্রতিনিধি কিউলকে হোটেলটির ওপরের তলায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করার আমন্ত্রণ জানান। কিউলের অভিযোগ, সেখানে যাওয়ার পর ট্রাম্প পেছন থেকে তাঁকে ধরে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন।

প্রতিবেদনে কিউলের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, কথিত ঘটনার সময় তাঁর পোশাক ছিঁড়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তপাত ও কালশিটে দাগ দেখা দেয়। তিনি ঘটনাটিকে ‘নৃশংস’ বলে বর্ণনা করেছেন।

কিউলের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার পর ট্রাম্প তাঁকে বিছানার কিনারায় বসান। এরপর আবারও ভিসা ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি ঘটনাটি গোপন রাখার কথাও বলেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বক্তব্য হিসেবে উদ্ধৃত করা হয়েছে, ‘যা-ই ঘটুক, সবকিছু আগের মতো চলতে হবে।’

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়—এমন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনের উদ্ধৃত বিবরণে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়, কিউলের দাবি এবং ডেমোক্র্যাটদের প্রতিবেদনে উত্থাপিত বক্তব্য হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

২০২৪ সালে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছিলেন কিউল

২০২৪ সালের অক্টোবরে ডেইলি মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিউল প্রথম প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, ১৯৯৩ সালে প্লাজা হোটেলে ট্রাম্প তাঁকে যৌন হয়রানি করেছিলেন। সে সময় তাঁর বক্তব্য ছিল, ট্রাম্প তাঁর ঠোঁট ও ঘাড়ে চুমু দিয়েছিলেন, পোশাক ওপরে তোলার চেষ্টা করেছিলেন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেছিলেন।

তবে ওই সাক্ষাৎকারে কিউল বলেছিলেন, ঘটনাটি এর চেয়ে বেশি দূর গড়ায়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে ট্রাম্পকে আগে কথা বলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এরপর ট্রাম্প শান্ত হয়ে যান বলে দাবি করেছিলেন তিনি।

ছয় ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতার সাবেক এই মডেলের ধারণা, তাঁর শারীরিক গড়ন তাঁকে আরও গুরুতর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছিল।

ডেইলি মেইলের ওই সময়কার প্রতিবেদনে কিউলের দীর্ঘদিনের এক বন্ধুর বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছিল। বন্ধুটির দাবি, কিউল প্রায় ২০ বছর আগেই তাঁর কাছে ট্রাম্পের অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণের কথা জানিয়েছিলেন। এত বছর পরও এ বিষয়ে কিউলের বর্ণনায় পরিবর্তন আসেনি বলে দাবি করেন ওই বন্ধু।

২০২৪ সালে অভিযোগ সামনে আসার পর ট্রাম্পের তৎকালীন প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। বর্তমান প্রতিবেদন প্রকাশের পরও হোয়াইট হাউস একইভাবে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

আরও চার নারীর অভিযোগ প্রতিবেদনে

ডেমোক্র্যাটদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিউল ছাড়াও আরও চার নারীর বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প, এপস্টেইন এবং তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিরা প্লাজা হোটেলে আয়োজিত সুন্দরী প্রতিযোগিতাকে তরুণী ও কিশোরীদের লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। তবে এ দাবিরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে দেওয়া বিবৃতিতে প্রতিনিধি পরিষদের কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য জেমি রাসকিন বলেন, পাঁচ নারী সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে এপস্টেইনের সঙ্গে থাকা অবস্থায় বা তাঁর উপস্থিতিতে ট্রাম্প তাঁদের ধর্ষণ কিংবা যৌন নিপীড়ন করেছিলেন। অন্য নারীরা অভিযোগ করেছেন, এপস্টেইন বা তাঁর সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল তাঁদের ট্রাম্পের কাছে পাচার করার চেষ্টা করেছিলেন।

রাসকিন আরও অভিযোগ করেন, প্রেসিডেন্টকে রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষা দিতে ট্রাম্পের বিচার বিভাগ এ-সংক্রান্ত অপরাধের তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে। এটি ডেমোক্র্যাট নেতার অভিযোগ; এর সত্যতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য প্রতিবেদনের এই বিবরণে নেই।

এপস্টেইন ছিলেন একজন মার্কিন অর্থলগ্নিকারী, যিনি অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন শোষণ ও পাচারের গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে বিচার চলাকালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর সহযোগী হিসেবে পরিচিত ম্যাক্সওয়েলও যৌন পাচারসংক্রান্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। এপস্টেইনের সঙ্গে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনীতিকের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক চলছে। তবে কারও সঙ্গে পরিচয় বা সামাজিক সম্পর্ক থাকলেই এপস্টেইনের অপরাধে তাঁর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয় না।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ ও সেগুলো মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নিজে প্রার্থী না হলেও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে ভোটের ফল তাঁর প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেলে প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়ন, আইন প্রণয়ন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন করে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তাই শুধু ব্যক্তিগত বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এগুলো মার্কিন রাজনীতিতে এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নকেও সামনে এনেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ, স্বাধীন তদন্ত এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।