সুন্দরবনের কুখ্যাত ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ ২৭ সদস্য অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ নিয়ে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় দস্যুতা, জেলে ও বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়সহ নানা অপরাধে জড়িত এই বাহিনীর সদস্যরা শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন।
সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে বাগেরহাটের মোংলা থানার সুন্দরবনের চরপুটিয়া খালসংলগ্ন এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তাদের কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেন বাহিনীর সদস্যরা।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া সেলের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাভভির আলম সুজন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের নির্দেশনায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করছে কোস্ট গার্ড।
কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুন্দরবনে দস্যুতা নির্মূলে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব অভিযানের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি দস্যু বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ৪৫ জন বনদস্যুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ৪২ জন জেলে ও বাওয়ালিকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়ার পর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কোস্ট গার্ড জানায়, ধারাবাহিক অভিযানের কারণে সুন্দরবনে সক্রিয় দস্যু বাহিনীগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং অভিযানের চাপে এর আগে ছোট সুমন বাহিনীর সাত সদস্য এবং বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর তিন সদস্য অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখ তার সহযোগীদের নিয়ে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন।
আত্মসমর্পণের সময় বাহিনীর সদস্যরা কোস্ট গার্ডের কাছে বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেন। এর মধ্যে ছিল তিনটি বিদেশি বন্দুক, একটি এইট শুটার, একটি ফোর শুটার, পাঁচটি দেশীয় একনলা বন্দুক, ১৫টি দেশীয় পাইপগান, দুটি চায়না পাইপগান, ৩৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ এবং ৫৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ।
আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বাহিনী প্রধান জাহাঙ্গীর শেখ (৪৫)। এছাড়া মুজাহিদ গাজী (২৭), বিল্লাল শেখ (৩৫), জাহিদ হাসান (২৮), সুমন ঢালী (৩০), এরশাদ শিকারী (৪২), ওয়াহিদুজ্জামান (৩০), আইয়ুব শেখ (৪২), রাফসান ঢালী (৩০), পারভেজ শেখ (২৭), কারনুল শেখ (২৫), জহুরুল গাজী (৩৮), সিরাজুল তরফদার (৩৮), আমিনুল ইসলাম (৪০), আসাদুল ইসলাম (৪২), বাবুল শেখ (৪৫), শাহজাহান শেখ (৪২) ও হেলাল (৩৮)সহ অন্যরা রয়েছেন।
কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, আত্মসমর্পণকারীদের অধিকাংশই খুলনার পাইকগাছা, কয়রা ও বটিয়াঘাটা উপজেলার বাসিন্দা। এছাড়া বাগেরহাটের রামপাল, ফকিরহাট, কচুয়া, মোংলা ও শরণখোলা উপজেলার কয়েকজন এবং পিরোজপুর জেলার একজন সদস্যও এই দলে ছিলেন।
সুন্দরবন দীর্ঘদিন ধরে নদী ও খালঘেরা দুর্গম এলাকায় সক্রিয় দস্যুদের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে মাছ আহরণকারী জেলে, মধু সংগ্রহকারী মৌয়াল এবং কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহকারী বাওয়ালিরা প্রায়ই অপহরণ, চাঁদাবাজি ও হামলার শিকার হতেন। দস্যুদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের ফলে বর্তমানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড।
আত্মসমর্পণ করা সদস্যদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি সরকারের পুনর্বাসন নীতিমালার আওতায় তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
কোস্ট গার্ড আরও জানিয়েছে, সুন্দরবনে যারা এখনও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুন্দরবনকে পুরোপুরি নিরাপদ ও দস্যুমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং টহল কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
মন্তব্য