খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলা গানের স্বর্ণালি যুগের অন্যতম নেপথ্য কারিগর, প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক মো. শাহ নেওয়াজ আর নেই। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৩টা ৩৩ মিনিটে কানাডার মন্ট্রিয়ালের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। গুণী এই সুরকারের প্রয়াণের সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন তাঁর সন্তান স্বদেশ নেওয়াজ। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পরিবার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৭ ডিসেম্বর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে শাহ নেওয়াজকে মন্ট্রিয়ালের রয়েল ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ দুই মাস তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে একাধিকবার তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শনিবার ভোরে সুরের এই মহান জাদুকর পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে।
শাহ নেওয়াজ ছিলেন অত্যন্ত নিভৃতচারী এবং প্রচারবিমুখ একজন শিল্পী। বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানের বিকাশে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) বিভিন্ন নাটকের গানকে তিনি এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সুরের বৈশিষ্ট্য ছিল এর সহজাত গভীরতা এবং আবেগের নিখুঁত সংমিশ্রণ। কালজয়ী এই সুরকারের সৃষ্টিগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
| গানের প্রথম কলি | গীতিকার | কণ্ঠশিল্পী | উল্লেখযোগ্য তথ্য |
| রেললাইন বহে সমান্তরাল | নজরুল ইসলাম বাবু | মলয় কুমার গাঙ্গুলী ও দিলরুবা খান | ‘একদিন যখন’ নাটকে ব্যবহৃত। |
| আশা ছিল মনে মনে | জহির রায়হান ও নূরুজ্জামান শেখ | রফিকুল আলম | বাংলা রোমান্টিক গানের মাইলফলক। |
| বন্ধু রে তোর মন পাইলাম না | সংগৃহীত/প্রথাগত | শাহনাজ রহমতুল্লাহ | গভীর বিরহী চেতনার বহিঃপ্রকাশ। |
| সোনামুখী সুঁই দিয়ে… | নজরুল ইসলাম বাবু | শাহনাজ রহমতুল্লাহ | আধ্যাত্মিক ও মরমী সুরের ছোঁয়া। |
| তোমার ওই রূপ দেখে | সংগৃহীত | রফিকুল আলম | বিটিভির জনপ্রিয় একটি গান। |
শাহ নেওয়াজ এমন একজন সংগীত পরিচালক ছিলেন, যাঁর সুরে কণ্ঠ দেওয়াকে গর্বের বিষয় মনে করতেন সমসাময়িক শ্রেষ্ঠ শিল্পীরা। মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার, সৈয়দ আব্দুল হাদী, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন এবং এন্ড্রু কিশোরের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা তাঁর সুরে অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর সুরের মূর্ছনা পৌঁছে গিয়েছিল ভারত পর্যন্ত। প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ভূপেন হাজারিকা এবং স্বনামধন্য গায়িকা হৈমন্তী শুক্লা তাঁর সুর করা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক মানের সংগীত প্রতিভারই প্রমাণ দেয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শাহ নেওয়াজ স্ত্রী, এক কন্যা ও দুই পুত্রসহ অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী রেখে গেছেন। তাঁর অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী কানাডার মন্ট্রিয়ালেই তাঁকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করতেন এই শিল্পী, তবে তাঁর সৃষ্টিগুলো তাঁকে আজীবন অমর করে রাখবে। বাংলা গানের ইতিহাসে ‘রেললাইন বহে সমান্তরাল’ কিংবা ‘আশা ছিল মনে মনে’র মতো গানগুলো যতদিন বাজবে, শাহ নেওয়াজ ততোদিন বেঁচে থাকবেন শ্রোতাদের হৃদয়ে। তাঁর প্রয়াণ কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং বাংলা সংগীতের একটি সমৃদ্ধ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি।