খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 26শে আশ্বিন ১৪৩২ | ১১ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের কৌশলগত দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ আবারও দক্ষিণ এশিয়ায় ওয়াশিংটনের ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনার দিকে নজর আকর্ষণ করেছে। এটি এমন একটি অঞ্চল যা যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মধ্যে দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল দেশ বাংলাদেশ, গত বছরের কয়েক মাসের অস্থিরতা ও ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিলেও দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তেজনাপূর্ণ এবং বিদেশী হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেন্ট মার্টিনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের সম্ভাবনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উত্থাপিত অভিযোগ এখনও ঢাকার রাজনৈতিক ও মিডিয়ার আলোচ্য বিষয়।
সেন্ট মার্টিন: বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ছোট দ্বীপ
মাত্র তিন বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মালাক্কা প্রণালীর কাছে অবস্থানের কারণে এটি সামরিক ও বাণিজ্যিক চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ যিনি করবেন, তিনি ভারত মহাসাগরে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রভাবিত করতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এ অঞ্চলে উপস্থিতি ‘Free and Open Indo-Pacific’ পরিকল্পনার অংশ, যেখানে চীন ও ভারতও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ অঞ্চলের ওপর প্রভাব রাখতে চায়।
সামরিক সুবিধা অর্জনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দাবি করেছেন, তার শাসনকালে ওয়াশিংটন তাকে সেন্ট মার্টিনে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য চাপ দিয়েছিল। তিনি বলেন, এই ছাড় নিলে পশ্চিমাদের রাজনৈতিক সমর্থন বজায় রাখা সম্ভব হত।
বর্তমান প্রশাসন ও কর্মকর্তারা হাসিনার এই দাবি অস্বীকার করেছে। তবে পশ্চিমা গণমাধ্যম এ সন্দেহকে আরও দৃঢ় করেছে যে, ওয়াশিংটন তার স্বার্থ অনুসারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন করতে চায়।
বাংলাদেশের ঘটনা ও রঙিন বিপ্লবের মিল
আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকরা বাংলাদেশের ঘটনাকে পশ্চিমা সমর্থিত রঙিন বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার দাবির কারণে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত রাজনৈতিক ও সরকারবিরোধী রূপ নেয়। তরুণ ও ছাত্র সমাজের ভূমিকা, এনক্রিপ্টেড মেসেঞ্জারের ব্যবহার, আন্তর্জাতিক এনজিও কার্যক্রম এবং সামাজিক নেটওয়ার্কে সহিংসতার ছবি প্রচার—সবকিছু ইউক্রেন, জর্জিয়া ও সার্বিয়ার কৌশলের সঙ্গে মিল রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটন এই কৌশল ব্যবহার করে তার নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন স্বাধীন সরকারগুলোর ওপর পরোক্ষ চাপ প্রয়োগ করতে চায়।
ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ড. ইউনূস
গত বছর দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর অর্থনীতিবিদ ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন। যদিও তিনি সংস্কারকামী হিসেবে পরিচিত, তার ক্লিনটন পরিবার ও জর্জ সোরোসের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে ওয়াশিংটনের পছন্দের নেতা হিসেবে দেখায়। হাসিনার আমলে এমন খবর প্রকাশ হয়েছিল যে, সরাসরি আমেরিকান চাপে ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলাও স্থগিত হয়েছিল। এখন তার প্রত্যাবর্তনকে পর্যবেক্ষকরা ‘রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্নির্ধারণ’ হিসেবে দেখছেন।
ভারত ও চীনের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের ঘটনাবলী ভারতের ও চীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। শেখ হাসিনার সরকারকে সবসময় সমর্থন করা নয়াদিল্লি এখন পূর্ব সীমান্তে আমেরিকান প্রভাবের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে তার উপস্থিতি শক্তিশালী করতে চাইছে এবং মার্কিন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
ঢাকা কেন্দ্রিক ক্ষমতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
অন্তর্বর্তী সরকার অবাধ নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাংলাদেশ এখনও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, দেশটি এখন ওয়াশিংটন, বেইজিং ও নয়াদিল্লির মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আমেরিকা সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান সুসংহত করতে চায়। চীন বাণিজ্য রুট ও অর্থনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে চাইছে। ভারতও বিদেশী প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করতে চায়।
এই অবস্থায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল অভ্যন্তরীণ ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং সমগ্র ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকেও প্রভাবিত করবে। সূত্র: পার্সটুডে
খবরওয়ালা/টিএসএন