পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অথচ এর আগে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে পরিবারের কাছে কোনো খবর পৌঁছায়নি। শেষবারের মতো ছেলের সঙ্গে কথা বলা কিংবা তাঁকে দেখার সুযোগও পাননি মা-বাবা। নিয়মিত ফোনে কথা বলার অভ্যাস থাকায় তাঁরা অপেক্ষায় ছিলেন ছেলের পরবর্তী ফোনকলের। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে এক মর্মান্তিক সংবাদে।
নজরুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তাঁর পরিবারে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ। তাঁদের প্রশ্ন, মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকরের আগে পরিবারকে কেন জানানো হলো না এবং শেষবারের মতো যোগাযোগের সুযোগ কেন দেওয়া হয়নি?
পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় সৌদি আরবে পাড়ি
নজরুল ইসলাম ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের একটি কৃষক পরিবারের বড় সন্তান। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করা এবং স্বজনদের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা নিয়ে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর তিনি সৌদি আরবে যান। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।
কিন্তু বিদেশে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় তাঁর জীবনে নেমে আসে বড় বিপর্যয়। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদ থেকে সুইটি আক্তার নামের এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে গ্রেপ্তার করে সৌদি পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এরপর থেকে রিয়াদ ও মক্কার বিভিন্ন কারাগারে প্রায় তিন বছর তিন মাস বন্দি ছিলেন নজরুল।
এই দীর্ঘ সময়ে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। মা রহিমা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকা অবস্থাতেও প্রতি রোববার নিয়মিত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন নজরুল। সেই ফোনকল ছিল মা-বাবার জন্য ছেলের খোঁজ পাওয়ার অন্যতম ভরসা। কিন্তু গত সপ্তাহে আর ফোন আসেনি। প্রথমে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও পরে গণমাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানতে পারেন তাঁরা।
একই ঘটনায় সুইটি আক্তারেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে প্রকাশিত সংবাদে জানানো হয়েছে।
ছেলের মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েছেন মা-বাবা
নজরুলের মৃত্যুর খবর তাঁর বাবা আব্দুল বাছিরকে গভীরভাবে ভেঙে দিয়েছে। অসুস্থ শরীরে তিনি বারবার ছেলের কথা স্মরণ করে বিলাপ করছেন। তাঁর বক্তব্যে ফুটে উঠেছে অসহায়ত্ব, শোক এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে কিছু না জানানোর বেদনা।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তাঁদের আগে থেকে অবহিত করা হয়নি। ফলে ছেলের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলা, তাঁর খোঁজ নেওয়া কিংবা মৃত্যুর আগে কোনো বার্তা পাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়নি।
মা রহিমা বেগমের জন্য এই শোক আরও অসহনীয় হয়ে উঠেছে নিয়মিত ফোনকলের স্মৃতিতে। যে ছেলের কণ্ঠস্বর শোনার জন্য প্রতি রোববার অপেক্ষা করতেন, সেই ছেলের মৃত্যুর খবর তাঁকে জানতে হয়েছে অন্যের মাধ্যমে। সন্তানের মরদেহ কোথায় রয়েছে, কীভাবে তা দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে—এসব অনিশ্চয়তাও পরিবারের কষ্ট বাড়িয়েছে।
ভাতিজার মৃত্যুসংবাদে প্রাণ গেল ফুফুর
নজরুলের মৃত্যুর খবরের পর তাঁর পরিবারের শোক আরও গভীর হয়েছে ফুফু আবেদা বেগমের আকস্মিক মৃত্যুতে। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাতিজার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শোনার পর বুধবার রাতেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।
চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় নজরুলকে ঘিরে পরিবারের অনেক আশা ছিল। বিদেশে কাজ করে পরিবারের অভাব দূর করবেন, স্বজনদের পাশে দাঁড়াবেন—এমন প্রত্যাশা থেকেই তাঁকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই তাঁর জীবন শেষ হয়ে গেল। এখন একদিকে সন্তানের জন্য মা-বাবার আহাজারি, অন্যদিকে প্রিয় স্বজনকে হারানোর বেদনা—সব মিলিয়ে বিরামপুর গ্রামের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি
নজরুলের পরিবার ও এলাকাবাসী তাঁর মরদেহ দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, সরকার যেন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে রাষ্ট্রীয় খরচে মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করে। এতে শোকাহত মা-বাবা অন্তত শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে পারবেন এবং নিজ গ্রামের মাটিতে তাঁকে দাফন করার সুযোগ পাবেন।
বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় যাওয়া একজন তরুণের এমন পরিণতি পরিবারটির সামনে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না পাওয়া এবং মরদেহ দেশে ফেরানোর অপেক্ষা—সবকিছু মিলিয়ে স্বজনদের শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা প্রশ্ন।
তবে নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, সৌদি আরবের বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে অবহিত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে পরিবারের অভিযোগের পাশাপাশি এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া জরুরি।
এই মুহূর্তে শোকাহত পরিবারের প্রধান চাওয়া একটাই—নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। জীবিত অবস্থায় যাঁর সঙ্গে শেষবার দেখা করার সুযোগ পাননি মা-বাবা, অন্তত মৃত্যুর পর যেন তাঁকে নিজ হাতে শেষ বিদায় জানাতে পারেন তাঁরা।


