হিমালয়ের শীতল মরুভূমি হিসেবে পরিচিত হিমাচল প্রদেশের স্পিতি উপত্যকা একসময় তুষার চিতার সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্বে জর্জরিত ছিল। দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে গবাদিপশুই জীবিকার প্রধান ভরসা; ফলে তুষার চিতা মাঝেমধ্যে ছাগল বা ভেড়া শিকার করলে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা একে শত্রু হিসেবে দেখত। শীতের তীব্রতা, খাদ্যের স্বল্পতা এবং পাহাড়ি পরিবেশে মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর বাসস্থান ঘেঁষাঘেঁষি হওয়ায় সংঘাত ছিল প্রায় অনিবার্য। তবে গত কয়েক বছরে এই বাস্তবতা আমূল বদলাতে শুরু করেছে। পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় নারীদের একটি সংগঠিত দল—‘শেনমো’। স্থানীয় ভাষায় তুষার চিতাকে বলা হয় ‘শেন’, আর তাদের রক্ষায় নিয়োজিত নারীরা পরিচিত হয়েছেন ‘শেনমো’ নামে।
এই নারীরা আধুনিক বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। ক্যামেরা ট্র্যাপ স্থাপন, পদচিহ্ন ও মলমূত্র শনাক্ত করে তথ্য সংগ্রহ, সংগৃহীত ছবির ডিজিটাল বিশ্লেষণ—এসবই এখন তাদের দৈনন্দিন কাজের অংশ। অনেক সদস্যের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণির বেশি না হলেও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করেছেন। হাড়কাঁপানো শীতে ভোরে গৃহস্থালির কাজ সেরে তারা বেরিয়ে পড়েন পাহাড়ের পথে। ১৪ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায় পাতলা বাতাসে হাঁটতে হাঁটতে ক্যামেরা বসান, আবার নির্দিষ্ট সময় পর সেগুলো খুলে এনে তথ্য বিশ্লেষণে যুক্ত হন। প্রতিকূল আবহাওয়া, তুষারঝড় ও দুর্গম পথ—সব বাধা সত্ত্বেও তাদের কাজ থেমে থাকে না।
এই নিরলস প্রচেষ্টার ফল স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে তুষার চিতার সংখ্যায়। নিয়মিত নজরদারি ও স্থানীয় সচেতনতা বাড়ার ফলে শিকার ও প্রতিশোধমূলক হত্যা কমেছে। পাশাপাশি মানুষের জীবিকা সুরক্ষায় নেওয়া উদ্যোগ তুষার চিতার প্রতি বিদ্বেষ কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ‘শেনমো’ সদস্যরা গ্রামবাসীদের সরকারি বিমা ও ক্ষতিপূরণ প্রকল্পে যুক্ত হতে সহায়তা করছেন, পশুদের জন্য সুরক্ষিত ঘের নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করছেন এবং রাতের বেলা পশুপালকে পাহাড়ে না রেখে নিরাপদ স্থানে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে ক্ষতির আশঙ্কা কমে যাওয়ায় মানুষের মনোভাবেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
তুষার চিতা সংরক্ষণে অগ্রগতির চিত্র
| বছর | তুষার চিতার সংখ্যা | প্রধান উদ্যোগ |
|---|---|---|
| ২০২১ | ৫১টি | ক্যামেরা ট্র্যাপ বিস্তার, প্রাথমিক প্রশিক্ষণ |
| ২০২৩ | ৭০টির বেশি (আনুমানিক) | স্থানীয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বিমা সহায়তা |
| ২০২৪ | ৮৩টি | নিয়মিত নজরদারি, নিরাপদ ঘের প্রচলন |
সংরক্ষণবিদদের মতে, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া বন্যপ্রাণী রক্ষা টেকসই হয় না। স্পিতির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—যখন মানুষকে সমাধানের অংশ করা হয়, তখন সংঘাত কমে, বিশ্বাস বাড়ে এবং প্রকৃতি রক্ষার পথ সুগম হয়। শুরুতে সামান্য আয়ের আশায় কাজ শুরু করলেও এখন ‘শেনমো’ সদস্যরা দায়িত্ববোধ ও গর্বের জায়গা থেকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাদের কাছে তুষার চিতা আর ‘পাহাড়ের ভূত’ নয়; বরং স্পিতির প্রতিবেশব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাকে বাঁচানো মানেই নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা।