খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
বাংলা কবিতার সহজিয়া ধারার এক অনন্য নির্মাতা, বিশিষ্ট কবি, কলামিস্ট ও লেখক সমুদ্র গুপ্ত। এটি ছিল তাঁর সাহিত্যিক ছদ্মনাম; প্রকৃত নাম আবদুল মান্নান বাদশা।
১৯৪৬ সালের ২৩ জুন সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার হাসিল গ্রামে তাঁর জন্ম। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি ‘সমুদ্র গুপ্ত’ নামে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, সমালোচনা, নিবন্ধ ও কলাম লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র পরিচিতি লাভ করেন।
জীবনের পথচলা ছিল সংগ্রামমুখর ও বহুবর্ণিল। কখনও প্রেসের কর্মচারী, কখনও করাতকলের ম্যানেজার, কখনও জুটমিলের বদলি শ্রমিক, আবার কখনও উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী, ওষুধ ও চিকিৎসা-ব্যবসায়ী, প্রুফরিডার কিংবা সাংবাদিক—জীবিকার নানা বাস্তবতার মধ্য দিয়েই তিনি এগিয়ে গেছেন। এসব অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে গভীর জীবনবোধ ও মানবিকতার স্পর্শ।
বাংলাদেশের কবিতাঙ্গনে ষাটের দশক থেকেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি থাকলেও প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রোদ ঝলসানো মুখ’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে। পেশাগত জীবনের নানামুখী ব্যস্ততা ও প্রতিকূলতার কারণে তিনি সাহিত্যচর্চায় পুরোপুরি নিমগ্ন হতে পারেননি। তবু শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সাহিত্যসাধনা অব্যাহত রেখেছিলেন অদম্য নিষ্ঠা ও ভালোবাসায়।
সমুদ্র গুপ্ত ছিলেন আশাবাদী ও মানবতাবাদী চেতনার কবি। সচেতনভাবেই তিনি তাঁর কবিতাকে দুর্বোধ্যতার আবরণ থেকে মুক্ত রেখেছেন। সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত ও আপন সুরে তিনি পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন বাংলা কবিতার নির্মল সৌন্দর্য। তথাকথিত আধুনিক কবিতার জটিলতা অতিক্রম করে তাঁর এই ‘সহজিয়া’ কাব্যভাষা বাংলা কবিতায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত।
তাঁর কবিতা হিন্দি, উর্দু, অসমিয়া, নেপালি, চীনা, সিংহলি, ফরাসি, ইংরেজি, জাপানি ও নরওয়েজীয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। কবিতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশ-বিদেশে বহু সম্মাননা ও সংবর্ধনায় ভূষিত হয়েছেন।
২০০৮ সালের ১৯ জুলাই বাংলা সাহিত্যের এই নিবেদিতপ্রাণ কবি চিরবিদায় নেন। কিন্তু তাঁর সহজ-সুন্দর কাব্যভাষা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাহিত্যসাধনা বাংলা সাহিত্যের পাঠকের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
প্রয়াণ দিবসে কবি সমুদ্র গুপ্তের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর স্মৃতি ও সাহিত্যকীর্তি আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকুক চিরকাল।