খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কর্নেল আবু তাহের এমন এক নাম, যিনি অসীম সাহস, আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম এবং বিপ্লবী চেতনার এক অনন্য প্রতীক। তিনি ছিলেন একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার, সেনা কর্মকর্তা এবং বামপন্থী বিপ্লবী নেতা। স্বাধীনতার যুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর অবদান ও আত্মত্যাগ তাঁকে জাতির স্মৃতিতে এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কর্ণেল আবু তাহের জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৮ সালের ১৪ নভেম্বর, আসামের বাদারপুরে। পরবর্তীকালে তাঁর পরিবার নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। তাঁর পিতা মহিউদ্দিন আহমেদ এবং মাতা আশরাফুন্নেসা।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। চট্টগ্রামের প্রবর্তক বিদ্যালয় এবং কুমিল্লার ইউসুফ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে ১৯৫৯ সালে সিলেটের এমসি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে অধ্যয়ন করেন।
১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৬২ সালে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দক্ষতা, সাহসিকতা ও নেতৃত্বের গুণে অল্প সময়েই তিনি নিজেকে একজন কৃতী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে কাশ্মীর ও শিয়ালকোট ফ্রন্টে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন এবং গুরুতর আহত হন। সেই যুদ্ধে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য একমাত্র বাঙালি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ‘মেরুন প্যারাস্যুট উইং’ সম্মানে ভূষিত হন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চাকরি ত্যাগ করে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাঁকে ১১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, অসাধারণ সামরিক দক্ষতা এবং অদম্য সাহসিকতায় এই সেক্টরে পরিচালিত অসংখ্য অভিযান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
সম্মুখসমরে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি একটি পা হারান। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর মনোবলকে ভাঙতে পারেনি। বরং আরও দৃঢ় সংকল্পে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাঁর ভাই-বোনেরাও তাঁর নেতৃত্বে ১১ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন—যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বিরল পারিবারিক আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত।
স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক জীবন
স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্নেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান’-এ তিনি অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব দেন। এই ঘটনার মাধ্যমে জেনারেল জিয়াউর রহমান কারামুক্ত হন এবং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। তবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে কর্নেল তাহের নিজেই ক্ষমতার বলয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
বিচার ও মৃত্যুদণ্ড
পরবর্তীতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত সেই বিচারে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে, ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর, ২০১১ সালের ২২ মার্চ বাংলাদেশের উচ্চ আদালত সেই সামরিক আদালতের বিচার ও মৃত্যুদণ্ডকে অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং বিচারিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অন্যায়ের বিচারিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
কর্ণেল তাহের শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই নন; তিনি ছিলেন ন্যায়, সাম্য ও মানুষের মুক্তির স্বপ্নে বিশ্বাসী এক আপসহীন সংগ্রামী। ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতা কিংবা পদমর্যাদার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি জীবনভর লড়েছেন তাঁর আদর্শের জন্য। একটি পা হারিয়েও তিনি হারাননি সংগ্রামের শক্তি, হারাননি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন।
আজ তাঁর হত্যাদিবসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই অকুতোভয় বীর সন্তানকে। তাঁর আত্মত্যাগ, আদর্শ, দেশপ্রেম এবং সংগ্রামী জীবন নতুন প্রজন্মকে বারবার অনুপ্রাণিত করবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল আবু তাহেরের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র সালাম।