খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুলাই ২০২৬, ১০:১২ এএম
“আমাদের সবচেয়ে মধুর গানগুলোই সেই গান, যা গভীরতম বেদনার কথা বলে।”
রোমান্টিক কবিতার বিস্ময়কর প্রতিভা
ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে পার্সি বিশি শেলী (Percy Bysshe Shelley) এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি তাঁর স্বল্পায়ু জীবনেও কবিতার জগতে রেখে গেছেন অনন্য এক আলোকচ্ছটা। মানবমুক্তি, স্বাধীন চিন্তা, প্রেম, প্রকৃতি, সৌন্দর্য এবং বিপ্লবী চেতনার অসাধারণ সমন্বয় তাঁর কাব্যে তাঁকে রোমান্টিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
১৭৯২ সালের ৪ আগস্ট ইংল্যান্ডের সাসেক্সে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন স্যার টিমোথি শেলী। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ইটন কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হন।
মাত্র উনিশ বছর বয়সে তিনি “The Necessity of Atheism” শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসকে যুক্তি ও স্বাধীন অনুসন্ধানের আলোকে বিচার করার আহ্বান জানানো হয়। নিজের মত প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানানোয় ১৮১১ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। এই ঘটনাই তাঁর আপসহীন, মুক্তচিন্তার ব্যক্তিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে।
শেলী, জন কিটস ও লর্ড বায়রন—এই তিন কবিকে ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক আন্দোলনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিদের মধ্যে গণ্য করা হয়। তাঁদের কাব্যে প্রকৃতি, মানবিক অনুভূতি, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং কল্পনার জগৎ নতুন মাত্রা লাভ করে।
শেলীর অমর কবিতার মধ্যে রয়েছে Ozymandias, Ode to the West Wind, To a Skylark, The Cloud, Music, When Soft Voices Die, Adonais, The Mask of Anarchy এবং Prometheus Unbound। তাঁর প্রতিটি রচনায় ভাষার সৌন্দর্য, সঙ্গীতধর্মিতা এবং বিপ্লবী চেতনা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
কবিতার পাশাপাশি তিনি Zastrozzi এবং St. Irvyne নামে দুটি গথিক উপন্যাসও রচনা করেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক মেরি শেলী, যিনি অমর উপন্যাস Frankenstein-এর রচয়িতা।
জীবদ্দশায় শেলী তেমন স্বীকৃতি পাননি। তাঁর প্রগতিশীল ও প্রথাবিরোধী চিন্তা, ধর্ম ও রাজনীতি সম্পর্কে সাহসী অবস্থান তাঁকে সমকালীন সমাজে বিতর্কিত করে তুলেছিল। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর সাহিত্যকীর্তি বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদে পরিণত হয় এবং পরবর্তী বহু প্রজন্মের কবি-সাহিত্যিককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১৮২২ সালের ৮ জুলাই ইতালির লিভোর্নো থেকে লেরিচি ফেরার পথে ঝড়ের কবলে পড়ে তাঁর ছোট পালতোলা নৌকা ডুবে যায়। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। ইতিহাসবিদদের অধিকাংশের মতে এটি ছিল নৌকাডুবিজনিত দুর্ঘটনা; আত্মহত্যার দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
স্বল্পায়ু হলেও পার্সি বিশি শেলী আজও বিশ্বসাহিত্যের এক চিরসবুজ নাম। স্বাধীনতা, মানবমুক্তি, প্রেম এবং সৌন্দর্যের যে দীপ্ত উচ্চারণ তিনি তাঁর কবিতায় রেখে গেছেন, তা যুগে যুগে পাঠকের হৃদয়কে আন্দোলিত করে চলেছে।
“If Winter comes, can Spring be far behind?”
— Ode to the West Wind
এই একটি পঙ্ক্তিই যেন শেলীর সমগ্র জীবনদর্শনের প্রতীক—অন্ধকারের পরেই আসে আলোর প্রত্যাবর্তন, হতাশার পরেই জাগে নতুন আশার বসন্ত।
মন্তব্য