খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই জুলাই ২০২৬, ১০:৫ এএম
আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে যে কজন কবি নিজস্ব ভাষা, স্বতন্ত্র কাব্যভঙ্গি এবং গ্রামীণ জনজীবনের অনন্য শিল্পরূপ নির্মাণ করে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন, তাঁদের অন্যতম কবি আল মাহমুদ। প্রেম, প্রকৃতি, লোকজ ঐতিহ্য, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক অপূর্ব সংমিশ্রণে তিনি বাংলা কবিতাকে এনে দিয়েছেন নতুন মাত্রা। তাঁর কবিতায় যেমন বাংলার মাটি, নদী, কৃষক ও জনপদের ঘ্রাণ মিশে আছে, তেমনি রয়েছে মানুষের চিরন্তন প্রেম, বেদনা ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান।
১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল গ্রামের মোল্লাবাড়িতে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। পঞ্চাশের দশকে বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব ঘটে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’। এই গ্রন্থেই তাঁর মৌলিক কাব্যভাষার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত ‘কালের কলস’ এবং বিশেষ করে ‘সোনালি কাবিন’ তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করে। ‘সোনালি কাবিন’ বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে আজও পাঠক ও সমালোচকদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত। এর কবিতায় প্রেম, লোকজ জীবন, ঐতিহ্য ও ইতিহাস এক অনন্য শিল্পসৌন্দর্যে মিলিত হয়েছে।
কবিতা ছাড়াও আল মাহমুদ ছিলেন একজন শক্তিমান ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও আত্মজীবনীকার। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘একচক্ষু হরিণ’, ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ প্রভৃতি।
উপন্যাসেও তিনি রেখে গেছেন স্বকীয়তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ‘কাবিলের বোন’, ‘উপমহাদেশ’, ‘ডাহুকী’, ‘আগুনের মেয়ে’, ‘চতুরঙ্গ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। গল্পগ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ এবং আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে সমাদৃত।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, শিশু একাডেমি (অগ্রণী ব্যাংক) সাহিত্য পুরস্কার, কলকাতার ভানুসিংহ সম্মাননাসহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা।
আল মাহমুদের সাহিত্যজীবন যেমন ছিল সৃজনময়, তেমনি তাঁর ব্যক্তিজীবনও ছিল নানা বিতর্ক ও আলোচনায় পরিপূর্ণ। কিন্তু মতাদর্শগত ভিন্নতা অতিক্রম করেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অসামান্য কাব্যপ্রতিভা এবং শিল্পসৃষ্টির মূল্য আজও অনস্বীকার্য। বাংলা কবিতার ভাণ্ডারে তাঁর অবদান চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।
২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু কবির মৃত্যু হয় না—তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টিতে। ‘সোনালি কাবিন’-এর কবি আল মাহমুদও বেঁচে থাকবেন বাংলা ভাষা, বাংলা কবিতা এবং অগণিত পাঠকের হৃদয়ে, যতদিন বাংলা সাহিত্য বেঁচে থাকবে।
গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। বাংলা কবিতার এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের স্মৃতি ও সৃষ্টি আগামী প্রজন্মকে চিরকাল আলো দেখাক।
মন্তব্য