বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু বীর সেনানী রয়েছেন, যাঁদের অসীম সাহস, অসাধারণ সামরিক মেধা, রণকৌশল ও আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার, সংক্ষেপে এ টি এম হায়দার, তাঁদেরই একজন। তিনি ছিলেন একাধারে দক্ষ সেনা কর্মকর্তা, অসাধারণ গেরিলা প্রশিক্ষক, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা এবং রণাঙ্গনের এক সাহসী সংগঠক। সহযোদ্ধাদের কাছে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘মুকতু’।
১৯৪২ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতার ভবানীপুরে তাঁর জন্ম। বাবা মোহাম্মদ ইসরাইল এবং মা হাকিমুন্নেসা বেগম। তাঁদের পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল গ্রামে। শৈশব থেকেই মেধাবী ও সাহসী হায়দার পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। তিনি ছিলেন আর্টিলারি বিভাগের কর্মকর্তা এবং কমান্ডো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন দক্ষ সামরিক বিশেষজ্ঞ।
১৯৭১ : স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করলে বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের মতো এ টি এম হায়দারও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কুমিল্লা সেনানিবাস ছেড়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে যুক্ত হন এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশ নেন।
মেজর খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তমের নেতৃত্বাধীন ২ নম্বর সেক্টরে তিনি সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সেক্টরের প্রধান প্রশিক্ষণকেন্দ্র ছিল ভারতের ত্রিপুরার মেলাঘর। সেখানে তিনি হয়ে ওঠেন গেরিলা যোদ্ধাদের অন্যতম প্রধান প্রশিক্ষক ও সংগঠক।
তাঁর সামরিক দক্ষতা, অসাধারণ শৃঙ্খলাবোধ এবং কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল একদল দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ঢাকার বিখ্যাত ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরাও। শাফী ইমাম রুমী, বদিউল আলম, আবদুল হালিম জুয়েলসহ অসংখ্য তরুণ তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র চালনা, বিস্ফোরক ব্যবহার, গেরিলা আক্রমণ ও প্রতিরোধের কৌশল শিখেছিলেন।
ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা ঢাকার বুকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যানবাহন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করে দখলদার বাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁদের প্রতিটি সফল অভিযান ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালির অদম্য সাহস ও প্রতিরোধের একেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এ টি এম হায়দারের নেতৃত্ব ও প্রশিক্ষণে ২ নম্বর সেক্টরে গড়ে ওঠে অসংখ্য গেরিলা দল। তরুণ ছাত্র, যুবক ও সাধারণ মানুষকে তিনি রণাঙ্গনের দক্ষ যোদ্ধায় পরিণত করেছিলেন। তাঁর কাছে যুদ্ধ মানে শুধু অস্ত্র হাতে লড়াই নয়; যুদ্ধ মানে ছিল বুদ্ধিমত্তা, পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা, সাহস এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ
মেজর খালেদ মোশাররফ ১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর কসবার যুদ্ধে গুরুতর আহত হলে এ টি এম হায়দার ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি ছিলেন এই সেক্টরের উপ-অধিনায়ক। ৭ অক্টোবর গঠিত কে ফোর্সেও তিনি খালেদ মোশাররফের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এ বিজয়ে এ টি এম হায়দারের মতো সাহসী ও দক্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের অবদান ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব, সাহসিকতা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫ : ইতিহাসের এক কলঙ্কিত হত্যাকাণ্ড
স্বাধীনতার পরও এ টি এম হায়দারের জীবন থেমে থাকেনি। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশ একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়ে।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় আসে ৭ নভেম্বর। সেই দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও পালাবদলের এক মর্মান্তিক অধ্যায়ে প্রাণ হারান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দুই বীর সেনানী মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তম এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার, বীর উত্তম। একই দিনে নিহত হন কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা, বীর বিক্রমও।
যে সেনানীরা একদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় তাঁদেরই প্রাণ দিতে হলো স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও হত্যাকাণ্ডে!
এ এক গভীর বেদনা, এক নির্মম ঐতিহাসিক পরিহাস।
মাত্র ৩৩ বছর বয়সে নিভে যায় এ টি এম হায়দারের জীবনপ্রদীপ। কিন্তু তাঁর বীরত্ব, সামরিক প্রজ্ঞা, গেরিলা যুদ্ধের কৌশল এবং মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান কখনো মুছে যাওয়ার নয়।
আমাদের দায়, আমাদের স্মরণ
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতার এত বছর পরও বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ এ টি এম হায়দারের নাম, তাঁর অবদান ও আত্মত্যাগ সম্পর্কে যথেষ্ট জানে না। যে মানুষটি অসংখ্য তরুণকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, যাঁর প্রশিক্ষিত গেরিলারা শত্রুর শক্তিশালী ঘাঁটিতে আঘাত হেনে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়েছিলেন, সেই বীর সেনানীর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের সব বীরের অবদানকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মূল্যায়ন করতে হবে। তাঁদের সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগকে ধারণ করতে হবে আগামী প্রজন্মের চেতনায়।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের প্রশ্নও ইতিহাসের কাছে আজও গুরুত্বপূর্ণ।
বীর উত্তম লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার ছিলেন স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা এক অকুতোভয় যোদ্ধা। তিনি শুধু একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, গেরিলা যুদ্ধের এক অসাধারণ কারিগর।
যে বীরেরা জীবন দিয়ে স্বাধীনতা এনে দেন, ইতিহাসের পাতায় তাঁদের মৃত্যু হয় না।
বীর উত্তম এ টি এম হায়দার—আপনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
আপনার বীরত্ব, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ বাঙালি জাতি চিরদিন স্মরণ করবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।


