খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 16শে মাঘ ১৪৩২ | ২৯ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
স্মরণ
**পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল**
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন একেকটি নীরব দলিল—স্বপ্ন, বিশ্বাসভঙ্গ, সংগ্রাম ও আত্মসম্মানের ইতিহাস। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল তেমনই এক অনালোচিত অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নাম। পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী হয়েও যিনি রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের প্রতিবাদে সেই পদ ত্যাগ করে দেশ ছেড়েছিলেন—এই অধ্যায় আজও অনেকের কাছে অজানা।
পরাধীন ভারতের বাঙালি নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিনিধি ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। সমাজের প্রান্তিক মানুষের অধিকার, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও মর্যাদার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।
প্রারম্ভ ও রাজনৈতিক উত্থান
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের জন্ম ১৯০৪ সালের ২৯ জানুয়ারি, বৃহত্তর বরিশাল জেলায়।
১৯৩৭ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচনে তিনি নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কংগ্রেস প্রার্থীকে পরাজিত করেন—যা তৎকালীন রাজনীতিতে এক বিস্ময়কর ঘটনা ছিল।
রাজনৈতিকভাবে তিনি ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসুর অনুগামী। ১৯৪০ সালে নেতাজিকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে যুক্ত হন মুসলিম লিগের সঙ্গে।
দলিত রাজনীতি ও আম্বেদকর-যোগ
পরবর্তীকালে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভার সদস্য হন। এই সময়েই তিনি বাবাসাহেব ড. বি. আর. আম্বেদকরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দলিত ফেডারেশনের বাংলা শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। দলিত রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এ উদ্যোগ ছিল ঐতিহাসিক।
দেশভাগ, পাকিস্তান ও ভাঙা স্বপ্ন
১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তিনি দৃঢ়ভাবে নমঃশূদ্র সম্প্রদায়কে দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়তে নিষেধ করেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল—
কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নমঃশূদ্ররা দাবার বোর্ডের ছোট গুটি হয়ে যেতে পারে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানের প্রথম আইনসভার ৬৯ জন সদস্যের একজন নির্বাচিত হন এবং সেই আইনসভার অস্থায়ী চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে লিয়াকত আলি খানের মন্ত্রিসভায় আইন ও শ্রমমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। এই কারণে তাঁকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা পুরুষদের অন্যতম হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
বাংলার নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের উত্থানের প্রশ্নে তিনি মনে করেছিলেন—বর্ণহিন্দু নেতৃত্বের তুলনায় মুসলিম রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আস্থা রাখলে বেশি নিরাপত্তা ও সুযোগ মিলবে। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুতই সেই বিশ্বাসকে চূর্ণ করে দেয়।
ইস্তফা ও প্রতিবাদ
পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য, নিপীড়ন ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে তিনি অবশেষে ১৯৫০ সালের ৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি স্পষ্ট ভাষায় সংখ্যালঘুদের ওপর রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেন। এরপর তিনি পাকিস্তান ত্যাগ করে ভারতে চলে আসেন—একজন প্রতিষ্ঠাতা হয়েও রাষ্ট্রের অন্যায়ের অংশ হতে অস্বীকার করে।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
ভারতে ফিরে তিনি চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁয় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে এলেও ইতিহাসের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ় ও স্পষ্ট।
১৯৬৮ সালের ৫ অক্টোবর, বনগাঁতেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
উত্তরাধিকার
বরিশাল থেকে করাচির ক্ষমতার অলিন্দ হয়ে বনগাঁর নীরব জীবনে পৌঁছানো যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
ক্ষমতা নয়, নীতি ও আত্মসম্মানই রাজনীতির শেষ কথা।
তিনি ছিলেন এমন এক রাজনীতিক, যিনি ইতিহাসের সুবিধাজনক দলে নয়—সত্যের দিকেই দাঁড়িয়েছিলেন।