স্মরণে সিরাজুল আলম খান; রাজনীতির রহস্যপুরুষ, দাদাভাই

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ এবং রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে যাঁদের অবদান গভীরভাবে প্রোথিত, তাঁদের অন্যতম ছিলেন সিরাজুল আলম খান—সবার কাছে যিনি পরিচিত ছিলেন ‘দাদাভাই’ নামে। তিনি ছিলেন একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক সংগঠক, চিন্তাবিদ, লেখক এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেপথ্য স্থপতি।
১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলা-এর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতি, সমাজচিন্তা এবং বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ষাটের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বাঙালির মুক্তি কেবল সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে নয়, বরং একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সম্ভব।

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৬২ সালে তিনি গঠন করেন গোপন রাজনৈতিক সংগঠন নিউক্লিয়াস, যা পরে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামেও পরিচিতি লাভ করে। ইতিহাসবিদদের মতে, স্বাধীন বাংলাদেশের ধারণাকে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে লালন-পালন করার ক্ষেত্রে এই সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য যে রাজনৈতিক প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক ভিত্তি প্রয়োজন ছিল, তার অন্যতম কারিগর ছিলেন সিরাজুল আলম খান।
মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন এমন এক রাজনৈতিক কৌশলী, যিনি অনেক সময় সামনে না এসে নেপথ্যে থেকে ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করতেন। এ কারণেই তাঁকে অনেকে ‘রাজনীতির রহস্যপুরুষ’ বলে আখ্যায়িত করেন।

স্বাধীনতার পরও তিনি থেমে থাকেননি। দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সংঘটিত ‘সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থান’-এর নেপথ্য পরিকল্পনাকারীদের অন্যতম হিসেবেও তাঁর নাম আলোচিত হয়।

ব্যক্তিজীবনে তিনি প্রচারবিমুখ ছিলেন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও আলোচনার মঞ্চের চেয়ে চিন্তার জগৎকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা ও লেখালেখি আজও গবেষক, রাজনীতিবিদ ও ইতিহাস-অনুসন্ধানীদের আগ্রহের বিষয়।
২০২৩ সালের ৯ জুন এই কিংবদন্তি রাজনৈতিক চিন্তক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তবে তাঁর চিন্তা, স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তাঁর অবদান জাতির স্মৃতিতে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।

শ্রদ্ধাঞ্জলি, দাদাভাই।
স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নির্মাণে আপনার অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আপনাকে স্মরণ করবে একজন দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তক, সংগ্রামী সংগঠক এবং জাতির এক নীরব স্থপতি হিসেবে।

আপনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র সালাম ।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।