খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই আগস্ট ২০২৬, ১২:২১ পিএম
বাংলা গানের ভুবনে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা কেবল গান সৃষ্টি করেন না—তাঁরা একটি সময়কে সুরে বেঁধে রেখে যান। তাঁদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্ম তার ভালোবাসা, বিরহ, আনন্দ, বেদনা ও স্বপ্নকে খুঁজে পায়।
আলাউদ্দিন আলী তেমনই একজন কিংবদন্তি।
তিনি ছিলেন একাধারে সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার ও বেহালাবাদক। বাংলা চলচ্চিত্রের গানে তাঁর অবদান এতটাই বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ যে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বর্ণালি সংগীতের ইতিহাস লিখতে গেলে তাঁর নাম উচ্চারণ করতেই হয়।
সুরের পথে প্রথম যাত্রা
আলাউদ্দিন আলী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর, মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে। তাঁর বাবা ওস্তাদ জাদব আলী এবং মা জোহরা খাতুন।
মাত্র দেড় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি ঢাকার মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে চলে আসেন। তিন ভাই ও দুই বোনের সঙ্গে সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা।
সংগীতে তাঁর প্রথম হাতেখড়ি হয় ছোট চাচা সাদেক আলীর কাছে। শৈশবেই সুর ও বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
মাত্র কিশোর বয়সেই তিনি চলচ্চিত্রের সংগীত জগতে প্রবেশ করেন। ১৯৬৮ সালে বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু।
শুরুতে তিনি কিংবদন্তি সুরস্রষ্টা শহীদ আলতাফ মাহমুদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজের সঙ্গেও দীর্ঘদিন কাজ করার সুযোগ পান। এই সময়টিই তাঁর সংগীতজীবনের ভিত আরও শক্ত করে দেয়।
নিজস্ব সুরের স্বাক্ষর
আলাউদ্দিন আলীর সংগীতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি লোকজ সুরের মাটির গন্ধের সঙ্গে ধ্রুপদি সংগীতের সৌন্দর্যকে অপূর্বভাবে মিলিয়ে দিতে পারতেন।
তাঁর সুরে যেমন ছিল বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের সহজ-সরল আবেগ, তেমনি ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতের পরিশীলিত সৌন্দর্য।
ফলে তাঁর সুর হয়ে উঠেছিল একই সঙ্গে মাটির কাছাকাছি এবং নান্দনিক; সহজ অথচ গভীর; শ্রুতিমধুর অথচ শিল্পসম্মত।
প্রায় চার দশকের সংগীতজীবনে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য অসংখ্য কালজয়ী গান সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তানের বহু খ্যাতিমান শিল্পী।
সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা, এন্ড্রু কিশোর, সৈয়দ আব্দুল হাদী, শাম্মী আক্তারসহ বহু শিল্পীর কণ্ঠে তাঁর সৃষ্ট গান পেয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা।
কিছু গান শুধু গান নয়—একেকটি স্মৃতি
আলাউদ্দিন আলীর সৃষ্ট অসংখ্য গান বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে আজও বেঁচে আছে।
“একবার যদি কেউ ভালোবাসতো”,
“যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়”,
“ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়”,
“সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি”,
“আছেন আমার মোক্তার”—
এমন অসংখ্য গান তাঁর সুরের অনন্য স্বাক্ষর বহন করে।
তাঁর সুরে কখনো প্রেম এসেছে নদীর মতো শান্ত হয়ে, কখনো বিরহ এসেছে শরতের আকাশের মতো নিঃসঙ্গতায়, কখনো দেশপ্রেম এসেছে বুকের গভীর থেকে উঠে আসা দৃপ্ত উচ্চারণে।
আর এ কারণেই তাঁর গান শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের গান হয়ে থাকেনি; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা হয়ে উঠেছে স্মৃতির অংশ।
সুরকারের পাশাপাশি গীতিকারও
আলাউদ্দিন আলীর আরেকটি বিশেষ পরিচয়—তিনি শুধু সুরকার বা সংগীত পরিচালক ছিলেন না, ছিলেন একজন গীতিকারও।
গান লিখে তিনি অর্জন করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। অর্থাৎ তাঁর প্রতিভার বিস্তার ছিল সুরের পাশাপাশি কথার জগতেও।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অসামান্য। চলচ্চিত্রের দৃশ্য, চরিত্র, আবেগ ও কাহিনির সঙ্গে সংগীতকে এমনভাবে মিলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর, যা তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবন তাঁকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
তিনি শুধু পুরস্কার অর্জন করেননি—অর্জন করেছেন অগণিত শ্রোতার ভালোবাসা। আর একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে!
শেষ অধ্যায়
জীবনের শেষদিকে গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। কিন্তু অসুস্থ শরীরও তাঁর সৃষ্টির শক্তিকে মুছে দিতে পারেনি।
অবশেষে ২০২০ সালের ৯ আগস্ট, ৬৭ বছর বয়সে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বাংলা গানের এই অসামান্য স্রষ্টা।
একজন শিল্পীর মৃত্যু হয়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি কি কখনো মরে?
আলাউদ্দিন আলীও তাই বেঁচে আছেন তাঁর সুরে।
কোনো পুরোনো সিনেমার গানে,
কোনো হারিয়ে যাওয়া বিকেলের স্মৃতিতে,
প্রিয় মানুষের কণ্ঠে,
বিরহের নিঃশব্দ রাতে,
অথবা হঠাৎ রেডিও থেকে ভেসে আসা কোনো চেনা সুরে—
আজও ফিরে আসেন আলাউদ্দিন আলী।
বাংলা চলচ্চিত্রের গানের ভুবনে তিনি যে সুরের সাম্রাজ্য নির্মাণ করে গেছেন, তার আবেদন সময়ের সঙ্গে মুছে যাওয়ার নয়।
সুরের কোনো মৃত্যু নেই।
সুরকারেরও নয়।
শুধু মানুষটি চলে যান
তাঁর সৃষ্টি থেকে যায়।
থেকে যায় ভালোবাসা,
থেকে যায় স্মৃতি,
থেকে যায় অমর সুর।
শ্রদ্ধাঞ্জলি—
বাংলা গানের কিংবদন্তি সুরস্রষ্টা,
সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার ও বেহালাবাদক
আলাউদ্দিন আলীর স্মৃতির প্রতি।
আপনি নেই—
কিন্তু আপনার সুর আজও আমাদের হৃদয়ে বাজে।
মন্তব্য