খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের গর্ব, বিশ্ববিখ্যাত রসায়নবিদ ও ক্যানসার গবেষক অধ্যাপক ড. রথীন্দ্রনাথ বোস ছিলেন এমন এক বিজ্ঞানী, যিনি মেধা, অধ্যবসায় ও নিরলস গবেষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছিলেন। সলিড টিউমার ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনকারী তাঁর গবেষণা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—বাংলাদেশের মাটিতেও জন্ম নিতে পারে এমন প্রতিভা, যার অবদান মানবজাতির কল্যাণে যুগান্তকারী হয়ে উঠতে পারে।
নড়াইল সদর উপজেলার কমলাপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী বোস পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা বৈদ্যনাথ বোস এবং মাতা তৃপ্তিলতা বোস। সাত ছেলে ও চার মেয়ের বৃহৎ পরিবারে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। তাঁর এক ভাই ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। সেখান থেকে ১৯৭২ সালে স্নাতক এবং ১৯৭৩ সালে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে নিজের অসামান্য মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি শুধু একজন কৃতী শিক্ষার্থীই ছিলেন না, ছিলেন নেতৃত্বগুণেও অনন্য। ১৯৭৩–৭৪ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হল ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আগে তিনি দুই বছরেরও বেশি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতা করেন। এরপর ১৯৭৮ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে পিএইচডি সম্পন্ন করে গবেষণা ও অধ্যাপনায় আত্মনিয়োগ করেন এবং অল্প সময়েই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
পরবর্তীকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ফর রিসার্চ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও বায়োকেমিস্ট্রি এবং ফার্মাকোলজি অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।
ক্যানসার চিকিৎসায় প্লাটিনামভিত্তিক পরবর্তী প্রজন্মের ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণাই তাঁকে বিশ্বজুড়ে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। সলিড টিউমারের বিরুদ্ধে কার্যকর নতুন ওষুধ আবিষ্কারের লক্ষ্যে তাঁর গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। তাঁর উদ্ভাবিত ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আওতায় আসে এবং Fosplatin Therapeutics-এর লাইসেন্স লাভ করে।
ক্যানসার থেরাপিউটিকস ও ফুয়েল-সেল ইলেকট্রোক্যাটালিস্ট বিষয়ে তাঁর চারটি অপেক্ষমাণ পেটেন্টসহ মোট দশটি পেটেন্ট ছিল। গবেষণাপত্র, উদ্ভাবন এবং গবেষণা-নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানচর্চায় স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন বিনয়ী, সাদাসিধে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ একজন মানুষ। স্ত্রী অনিমা বোস, দুই সন্তান এবং বাংলাদেশের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হলেও তিনি কখনো নিজের শিকড়কে ভুলে যাননি।
২০১৫ সালের ১১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে এই প্রথিতযশা বিজ্ঞানীর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ববিজ্ঞান অঙ্গন হারায় একজন মেধাবী গবেষককে, আর বাংলাদেশ হারায় তার অন্যতম কৃতী সন্তানকে।
ড. রথীন্দ্রনাথ বোস আমাদের মনে করিয়ে দেন—জ্ঞান, গবেষণা ও মানবকল্যাণের প্রতি অবিচল নিষ্ঠাই একজন মানুষকে বিশ্বমঞ্চে অমর করে রাখে। তাঁর জীবন নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে।
গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর স্মৃতি অম্লান থাকুক, তাঁর কর্ম মানবকল্যাণে পথ দেখাক।