খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলা সংগীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বিশিষ্ট নজরুলসঙ্গীত শিল্পী ও বাফা (বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি/বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস—প্রচলিত ‘বাফা’)র সাবেক অধ্যক্ষ শিল্পী বেদার উদ্দিন আহমেদ ছিলেন বাংলা গানের ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তাঁর কণ্ঠে দেশাত্মবোধ, ইসলামী সঙ্গীত ও নজরুলগীতি পেয়েছিল গভীর আবেগ ও শৈল্পিক মহিমা।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৫ মার্চ ১৯২৭, বগুড়া জেলার শেরপুর সদর এলাকায়। পিতা মহিরউদ্দিন আহমেদ এবং মাতা নেকজাহান বেওয়া। শৈশবেই পিতৃহারা হওয়ায় জীবনের শুরুতেই দায়িত্ব ও সংগ্রামের স্বাদ পান তিনি। মায়ের মুখে ইসলামী গান শুনেই তাঁর সংগীতের প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়—যা পরবর্তীতে হয়ে ওঠে আজীবনের সাধনা।
১৯৪২ সালে তিনি সং পাবলিসিটি বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর কণ্ঠের গুণ ও সংগীতবোধ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কলম্বিয়া ও এইচএমভি গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে তাঁর গানের রেকর্ড প্রকাশিত হলে তিনি সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। সে সময় কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশন করতেন, যা তাঁকে তৎকালীন বাংলা সংগীতাঙ্গনের পরিচিত মুখে পরিণত করে।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বেতারে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে যোগ দেন। এখান থেকেই তাঁর শিল্পীসত্তা আরও বিস্তৃত পরিসরে বিকশিত হয়। বেদার উদ্দিন আহমেদ ছিলেন সমগ্র বাংলায় ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমেদের এক অনন্য সম্পূরক কণ্ঠ—যিনি আব্বাসউদ্দীনের ধারাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পঞ্চাশের দশকে নবগঠিত এক দেশের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে তিনি হয়ে ওঠেন এক অনুপ্রেরণার প্রতীক। দেশের নানা প্রান্তে আয়োজিত সংগীতসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি নজরুলের গান ও দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশন করে মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলেছিলেন দেশপ্রেম, ঐক্য ও আত্মমর্যাদার বোধ।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮০ সালে একুশে পদক লাভ করেন—যা তাঁর শিল্পীজীবনের গৌরবময় স্বীকৃতি।
জাতীয় জাগরণ ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে শিল্পী বেদার উদ্দিন আহমেদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর কণ্ঠ শুধু গান শোনায়নি—জাগিয়েছে মানুষ, শক্ত করেছে মনন ও চেতনাকে।
১৩ জানুয়ারি ১৯৯৮ সালে এই প্রথিতযশা সঙ্গীতশিল্পী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
কিন্তু তাঁর গান, তাঁর অবদান ও তাঁর আদর্শ আজও বেঁচে আছে—বাংলার মানুষের হৃদয়ে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।