ফৌজদারি মামলায় সমন ও ওয়ারেন্ট (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) জারি নিয়ে হয়রানির শেষ নেই। এসব ভুয়া সমন ও ওয়ারেন্ট কমাতে প্রচলিত পুরাতন পদ্ধতিতে পরিবর্তনের পর তা পাঠানো হবে অনলাইনে।
জানা গেছে, ফৌজদারি মামলা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনার জন্যই ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে সমন-ওয়ারেন্ট পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আর এজন্য পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (সিডিএমএস) বিচারকদের ও সরকারি আইন কর্মকর্তাদের সরাসরি প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার কাজ চলছে। সিডিএমএস পুলিশের একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ যেখানে মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাবতীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
সিডিএমএসে প্রবেশের বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দফায় দফায় মিটিং হয়েছে। দুই দপ্তরের কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন।
সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন শেষ হলে শিগগির উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতের বিচারকরা পুলিশের সিডিএমএসে প্রবেশ করে মামলার এফআইআর, তদন্তের অগ্রগতি, চার্জশিটসহ যাবতীয় নথি দেখার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস, সলিসিটর অফিসের কর্মকর্তারাও পুলিশের সিডিএমএসে প্রবেশ করতে পারবেন। বিচারক ও আইন কর্মকর্তারা সরাসরি এফআইআর, তদন্ত প্রতিবেদন, চার্জশিট দেখার সুযোগ পাবেন। সমন ও ওয়ারেন্ট জারির পর বিচারকরা তা সরাসরি সিডিএমএসে দাখিল করবেন। ফলে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ সহজেই সমন-ওয়ারেন্ট হাতে পেয়ে যাবে। এতে করে ভুয়া ওয়ারেন্টে হয়রানি কমবে। এ ছাড়া সমন পাঠানোর যে হয়রানি, তাও বন্ধ হবে। এ ছাড়া অনেক সময় আসামিপক্ষ থেকে জাল তথ্য দাখিল করে জামিন নেওয়ার যে অপচেষ্টা করেন, তাও বন্ধ হবে।
জানা গেছে, সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর পুলিশের সিডিএমএসে প্রবেশের বিষয়টি নিয়ে আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই দফায় পৃথক বৈঠক হয়। প্রথম দফায় আইন উপদেষ্টার সভাপতিত্বে আইন মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়। এরপর প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরীর সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে পুলিশের সিডিএমএসে প্রবেশের বিষয়ে ঐকমত্য হয়। এখন সিস্টেম রি-অ্যারেঞ্জের কাজ চলছে। যাদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে, তাদের জন্য আইডি ও পাসওয়ার্ড তৈরি করা হচ্ছে।
জানতে চাওয়া হলে অতিরিক্ত আইজিপি (পুলিশ মহাপরিদর্শক) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সমন ও ওয়ারেন্ট জারির ডিজিটালাইজেশনের প্রক্রিয়া চলছে। সিডিএমএসে প্রবেশের ব্যাপারে দুইপক্ষই ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এখন টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে কাজ চলছে। দ্রুতই এ কাজ শেষ হবে। এ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন হলে বিচার প্রার্থীদের হয়রানি ও দুর্ভোগ লাগব হবে।’
ইদানিং প্রায়ই গণমাধমে ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধমে নিরীহ ও সাধারণ মানুষকে বিভিন্নভাবে হয়রানির সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে উল্লেখ করে আদালত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নিম্নোক্ত নির্দেশ দেন—
১. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যুর সময় পরোয়ানা প্রস্তুতকারী ব্যক্তিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৭৫-এর বিধান মতে নির্ধারিত ফরমে উল্লিখিত চাহিদা অনুযায়ী সঠিক ও সুস্পষ্টভাবে তথ্যাদি দ্বারা পূরণ করতে হবে। যেমন: (ক) ব্যক্তি বা যেসব ব্যক্তি পরোয়ানা কার্যকর করবেন, তার বা তাদের নাম এবং পদবি ও ঠিকানা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। (খ) যার প্রতি পরোয়ানা ইস্যু করা হচ্ছে অর্থাৎ অভিযুক্তের নাম ও ঠিকানা এজাহার/নালিশি মামলা কিংবা অভিযোগপত্রে বর্ণিত মতে সংশ্লিষ্ট মামলার নম্বর ও ধারা (এ ক্ষেত্রে জিআর/নালিশি মামলার নম্বর) এবং ক্ষেত্রমত আদালতের মামলার নম্বর ও ধারা সুনির্দিষ্ট ও সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। (গ) সংশ্লিষ্ট জজ (বিচারক)/ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরের নিচে নাম ও পদবির সিল এবং ক্ষেত্রমত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকের নাম, পদবির সিলসহ বাঁ পাশে বর্ণিত সংশ্লিষ্ট আদালতের সুস্পষ্ট সিল ব্যবহার করতে হবে।
(ঘ) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রস্তুতকারী ব্যক্তির (অফিস স্টাফ) নাম, পদবি, মোবাইল ফোন নম্বরসহ সিল ও তার সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর ব্যবহার করতে হবে, যাতে পরোয়ানা কার্যকারী ব্যক্তির পরোয়ানার সঠিকতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহের উদ্রেক হলে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে এর সঠিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
২. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রস্তুত করা হলে স্থানীয় অধিক্ষেত্রে কার্যকরকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট পিয়নবহিতে এন্ট্রি করে বার্তাবাহকের মাধ্যমে তা পুলিশ সুপারের কার্যালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট থানায় প্রেরণ করতে হবে এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের/থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উক্ত পিয়নবহিতে সই করে তা বুঝে নিতে হবে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রেরণে ও কার্যকর করার জন্য পর্যায়ক্রমে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার কাজে লাগানো যেতে পারে। ৩. স্থানীয় অধিক্ষেত্রের বাইরের জেলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরকরণের ক্ষেত্রে পরোয়ানা ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সিলগালা করে এবং অফিসের সিলমোহরের ছাপ দিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রেরণ করবেন। ৪. সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিলমোহরকৃত খাম খুলে প্রাপ্ত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পরীক্ষা করে ইহার সঠিকতা নিশ্চিত করে পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য ব্যবস্থা নেবেন। তবে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ক্ষেত্রে সন্দেহের উদ্রেক হলে পরোয়ানায় উল্লিখিত পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে ইহার সঠিকতা নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবেন।
৫. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরকরণের জন্য পরোয়ানা গ্রহণকারী কর্মকর্তা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাওয়ার পর তা কার্যকরকরণের আগে পুনরায় পরীক্ষা করে যদি কোনোরূপ সন্দেহের উদ্রেক হয়, সেক্ষেত্রে পরোয়ানায় উল্লিখিত পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর মোবাইল ফোন নম্বরে ফোন করে তার সঠিকতা নিশ্চিত হয়ে পরোয়ানা কার্যকর করবেন।
৬. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনুসারে আসামিকে/আসামিদের গ্রেপ্তারের পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে উক্ত আসামি/আসামিদের আইন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেট/জজ আদালতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ উপস্থাপন করতে হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেট/জজ গ্রেপ্তারকৃত আসামি/আসামিদের জামিন না দিলে আদেশের কপিসহ হেফাজতি পরোয়ানামূলে আসামি/আসামিদের জেলহাজতে প্রেরণসহ ক্ষেত্রমত সম্পূরক নথি তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যুকারী জজ/ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বরাবর প্রেরণ করবেন।
৭. সংশ্লিষ্ট জেল সুপার কিংবা অন্য কেউ কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেফাজতি পরোয়ানামূলে প্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট আসামি/আসামিদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যুকারী আদালতকে এই মর্মে অবিলম্বে অবহিত করবেন যে, কোন থানার কোন মামলার সূত্রে কিংবা কোন আদালতের কোন মামলায় বর্ণিত আসামিদের উক্ত আদালতের ইস্যুকৃত পরোয়ানামূলে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে আসামিদের নতুন কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা পেলে জেল সুপার ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালত হতে সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে পরোয়ানা কার্যকর করবেন। রায়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব, আইন সচিব, আইজিপি, কারা মহাপরিদর্শক, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রারের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এই নির্দেশনা প্রত্যেক দায়রা জজ ও মেট্রোপলিটন দায়রা জজ, সব ট্রাইব্যুনাল, বিশেষ আদালতের বিচারক, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটদের জানাতে বলা হয়। সেই আদেশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অধস্তন আদালতগুলোতে রায়ের অনুলিপি প্রেরণ করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। কিন্তু তাতেও থেমে নেই ভুয়া ওয়ারেন্ট জারি। এ কারণেই অনলাইনে ওয়ারেন্ট পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খবরওয়ালা/এমইউ



