খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
দেশে অপহরণ সংক্রান্ত অপরাধের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট মাসে অপহরণের শিকার হয়েছেন ৭১৫ জন, যেখানে গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩৪০ জন। অর্থাৎ এক বছরে অপহরণের হার দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই ২০২৫ ছিল রেকর্ড সৃষ্টিকারী মাস—শুধু ওই এক মাসেই অপহরণের শিকার হয়েছেন ১০৯ জন। হিসাব বলছে, এ বছর প্রতিদিন গড়ে তিনজনের বেশি মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছেন, যা আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
২০২৪ সালে মোট ৬৪২টি অপহরণের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়। এর মধ্যে আগস্ট পর্যন্ত প্রথম আট মাসে ছিল ৩৪০টি। গড়ে প্রতি মাসে অপহরণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৪২ জনের কিছু বেশি। চলতি বছরের একই সময়ে মাসিক গড় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ জনের বেশি, যা দ্বিগুণেরও বেশি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) জানিয়েছে, গত ছয় বছরের মধ্যে এ বছরই মাসিক গড়ে সর্বোচ্চ অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, “২০২৫ সালে মাসে গড়ে ৮৬টির বেশি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬১ শতাংশ বেশি।”
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারম্যান জেড আই খান পান্না বলেন, “মামলার যে সংখ্যা আমরা দেখি, প্রকৃত ঘটনা তার চেয়ে অনেক বেশি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া অনেক সময় মামলা হয় না। দেশে এখন কার্যত আইনের শাসন নেই, তাই অপরাধ কমেনি, বরং বেড়েছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “প্রতি মাসেই অপরাধের তথ্য প্রকাশ করা হয়, এতে ট্রেন্ড বোঝা যায়। কখনো কোনো অপরাধ বাড়ে, আবার কমেও যায়। যে অপরাধগুলো বাড়ছে, সে বিষয়ে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি।’
সমাজবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, “অপরাধ বেড়ে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেটিকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে। নিয়ন্ত্রণের বদলে ব্যাখ্যা দাঁড় করানো আসলে অপেশাদারিত্ব। এর ফলে অপরাধীরা সুযোগ পায়, রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশ ব্যবহৃত হওয়ায় সমাজে অপরাধ আরও বেড়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, “দৈনিক গড়ে তিনজন মানুষ অপহৃত হচ্ছে—এটি স্পষ্ট করে যে দেশে আইনের শাসনের বড় ঘাটতি রয়েছে।’
অপহরণের প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা আর্থিক সঙ্কটকে দায়ী করছেন। রাজনৈতিক ও পারিবারিক শত্রুতা, ধর্ষণসহ নানা কারণ থাকলেও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাই বেশি। এতে প্রায়ই জড়িত থাকে পরিবার, আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রতিবেশীরাও।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, দেশে এক বছরের ব্যবধানে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনই অনেককে অপরাধে ঠেলে দিচ্ছে।
চট্টগ্রামের পটিয়ায় ১৭ সেপ্টেম্বর মুরগি ব্যবসায়ী নুরুল আবছারকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। তবে পুলিশ দুই ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে উদ্ধার করে।
কুমিল্লায়, অপহরণের ৩৬ দিন পর রিকশাচালক মেহেদী হাসানের মাথার খুলি উদ্ধার হয়। তদন্তে জানা গেছে, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের জন্যই তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে, ১৫ সেপ্টেম্বর মো. সানি আহম্মেদকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয় আট লাখ টাকা। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে এবং পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।
খবরওয়ালা/ এমএজেড