মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) তুরস্কের সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স দুটি এমকিউএম-১৭০ মডেলের ড্রোনের বিরুদ্ধে বিশেষ ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা তড়িৎ যুদ্ধব্যবস্থা প্রয়োগ করে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্রোন দুটির কার্যক্রম ব্যাহত করে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানি বাহিনী।
তাসনিমের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই অভিযানের মধ্য দিয়ে একই ধরনের ড্রোন ইরানের নিয়ন্ত্রণে আসার সংখ্যা বেড়ে চারটিতে দাঁড়িয়েছে। ড্রোনগুলোকে নির্ধারিত মিশন সম্পন্ন করা থেকে বিরত রাখাই ছিল এই অভিযানের লক্ষ্য। তবে ড্রোন দুটি কোথায় অবতরণ করেছে, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা কী কিংবা অভিযানের সময় কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
গত সপ্তাহেও একই ধরনের কয়েকটি ঘটনার দাবি করেছিল ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা শুক্রবার জানায়, কেশম দ্বীপের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় একই মডেলের একটি ড্রোন ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করা হয়েছে।
এর আগের দিন আইআরজিসি নৌবাহিনী দাবি করে, হরমুজ প্রণালির পশ্চিম অংশে আরেকটি ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেটিকে অক্ষত অবস্থায় অবতরণ করানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে ড্রোনগুলোকে ঘিরে দুই দেশের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, নৌপরিবহন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় তার প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে কেশম দ্বীপের আশপাশের জলসীমা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এলাকাটি ইরানের সামরিক নজরদারি ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ অঞ্চলে ড্রোনের উপস্থিতি এবং সেগুলোকে প্রতিহত করার দাবি দুই দেশের সামরিক সক্ষমতা ও নজরদারি কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
এদিকে, সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই সোমবার জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান।
তিনি আরও জানান, ইরানের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান যোগাযোগপ্রক্রিয়া সহজ করতে দোহা সফর করেছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্য কমানোর চেষ্টা চলছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে আলোচনায় কী কী বিষয় উঠে এসেছে কিংবা কোনো সমঝোতার অগ্রগতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর জবাবে ইরানও বিভিন্ন পাল্টা আক্রমণ চালায়। ধারাবাহিক সংঘাতের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
এরপর ১৮ জুন হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তবে প্রণালির নিরাপত্তা, সামরিক উপস্থিতি এবং নৌযান চলাচলের অধিকার নিয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য থাকায় সমঝোতাটির বাস্তবায়ন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার ইরানি দাবি নতুন করে দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের উত্তেজনা সামনে এনেছে। একদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় সামরিক তৎপরতা ও পাল্টাপাল্টি দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে ড্রোন ভূপাতিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং ঘটনার স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত ইরানের দাবির সত্যতা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।


