খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের এক অমূল্য ভাণ্ডার এবং এশিয়ার বৃহত্তম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীকে দূষণমুক্ত রাখতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। চলতি বছর হালদা নদীর অববাহিকাভুক্ত খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি অংশে তামাক চাষ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সাফল্যের কথা জানানো হয়। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান হালদা নদীর মৎস্য হেরিটেজ সংরক্ষণে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হালদা নদীর পানি দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এর অববাহিকায় তামাক চাষ। তামাক চাষে ব্যবহৃত অত্যধিক পরিমাণ ক্ষতিকর কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানির সাথে মিশে সরাসরি হালদা নদীতে গিয়ে পড়ত। এতে নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ে, যা কার্পজাতীয় মাছের প্রজনন এবং জলজ প্রাণীর অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত বছরও মানিকছড়ি অংশে ১১ জন তামাকচাষি প্রায় ২০ একর জমিতে তামাক চাষ করেছিলেন, যা এবার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
হালদার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গত ৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করে। উক্ত প্রজ্ঞাপনে হালদা নদী মৎস্য হেরিটেজের গেজেট সংশোধন করে পুরো অববাহিকা অঞ্চলে তামাক চাষ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন এবং মানিকছড়ি উপজেলা প্রশাসন মাঠ পর্যায়ে কঠোর মনিটরিং শুরু করে। তামাকের চারা রোপণের মৌসুম অর্থাৎ ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে কৃষকদের সচেতন করার পাশাপাশি সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি কড়াভাবে অবহিত করা হয়।
হালদা অববাহিকায় তামাক চাষ বন্ধের কার্যক্রম এক নজরে:
| প্রধান কার্যক্রম | বিবরণ ও সময়কাল |
| গেজেট সংশোধন | ৫ নভেম্বর ২০২৫; তামাক চাষ নিষিদ্ধ ঘোষণা। |
| জেলা কমিটির সিদ্ধান্ত | ২১ ডিসেম্বর; তামাক ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ। |
| মাঠ পর্যায়ের উদ্যোগ | উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য দপ্তরের যৌথ মনিটরিং। |
| বিকল্প ব্যবস্থা | কৃষকদের সরিষা, ভুট্টা ও সবজি চাষে উদ্বুদ্ধকরণ। |
| বর্তমান স্থিতি | ২০২৬ সালে তামাক চাষ সম্পূর্ণ শূন্য (০) একর। |
তামাক চাষ বন্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। কৃষকদের তামাকের পরিবর্তে সরিষা, ভুট্টা এবং বিভিন্ন অর্থকরী সবজি চাষে প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার জানিয়েছেন, হালদা নদী রক্ষা করা কেবল একটি অঞ্চলের স্বার্থ নয়, এটি জাতীয় স্বার্থ। ভবিষ্যতে এই অববাহিকায় যাতে কোনোভাবেই তামাক চাষ পুনরায় ফিরে আসতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত তদারকি ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হালদা নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার এবং মা মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগকে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো স্বাগত জানিয়েছে। প্রশাসনের এই কঠোর তদারকি অব্যাহত থাকলে হালদা নদী তার পুরনো যৌবন ফিরে পাবে এবং দেশের মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।