খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
ঢাকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তন তখন সুরের মোহনীয় আবেশে আচ্ছন্ন। উপমহাদেশের বরেণ্য সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার একের পর এক পরিবেশনায় মুগ্ধ পুরো দর্শকসারি। সুরের এই মহোৎসবের শেষভাগে মঞ্চে এসে উপস্থাপনার দায়িত্বে থাকা দেশের নন্দিত অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রকর আফজাল হোসেনের সাথে হ্যান্ডশেক করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রুনা লায়লা। তবে ঠিক সেই মুহূর্তেই চিরচেনা রসবোধ ফুটিয়ে তুলে রুনা এমন এক মন্তব্য করলেন, যা শুনে পুরো মিলনায়তনে হাসির রোল পড়ে যায়।
আফজাল হোসেনকে ডেকে নিয়ে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বলেন, ব্যস্ততার মধ্যেও সময় দেওয়ায় তিনি সত্যিই কৃতজ্ঞ। এরপর তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করার পর স্মিত হেসে যোগ করেন, “আমি কিন্তু সবার সঙ্গে হাত মেলাই না। কারণটাও জেনে নেন—আংটিগুলো আছে না, এগুলো যদি হুট করে কেউ নিয়ে নেয়!” তাঁর এমন প্রাণখোলা মন্তব্যে হেসে ওঠেন সবাই। পরিবেশটা আরও হালকা করতে তিনি রসিকতা করে আবার বলেন, “তবে উনি (আফজাল হোসেন) তো নিরাপদ।”
আসলে গানের পাশাপাশি মঞ্চে রুনা লায়লার আঙুলে শোভা পাওয়া বাহারি ডিজাইনের হীরার আংটিগুলো নিয়েও ভক্তদের কৌতুহলের শেষ নেই। তাঁর এই সংগ্রহের ইতিহাস বেশ পুরনো ও আবেগঘন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে করাচিতে থাকাকালীন মা আমিনা লায়লার কাছ থেকে পাওয়া একটি ডায়মন্ড আংটি উপহার পাওয়ার মাধ্যমে এই বিশেষ সংগ্রহের যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ পেশাদার গান গাইবার ক্যারিয়ারে বিভিন্ন সময়ে নিজের পছন্দমতো দুর্লভ সব হীরার আংটি সংগ্রহে যুক্ত করেছেন তিনি। কনসার্টে মাইক্রোফোন হাতে তাঁর সুরের মায়াজালের মতোই হাতের এই অলঙ্কারগুলোও সবসময় দর্শকের বাড়তি নজর কাড়ে।
অনুষ্ঠানের পর পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন আফজাল হোসেন। প্রায় চার দশক আগের বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমাদের জীবনের সাধারণ বিস্ময়গুলো হয়তো সময়ের সাথে হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ থাকেন যাঁরা চিরকাল বিস্ময় হয়েই থাকেন। আমি তখন অভিনয়ের জগতে একেবারে নতুন। রিহার্সাল শেষে একদিন দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দেখি স্টুডিও থেকে বের হচ্ছেন রুনা লায়লা। তিনি আমাকে খেয়াল না করলেও আমি দূর থেকে তাঁকে দেখছিলাম। সেই ক্ষণে তাঁর উপস্থিতি দেখে মাথার ভেতরটা কেমন যেন ঘুরছিল, বাধ্য হয়ে সিঁড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম।”
আফজাল হোসেন আরও বলেন, তারকাদীপ্তির অনেক রূপ তিনি দেখেছেন, যার অনেকেই সময়ের আবর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তবে রুনা লায়লা নিজেকে এমন এক উচ্চতায় ধরে রেখেছেন যে চার দশক আগেও তিনি যেমন মহাজাগতিক তারকার মতো উজ্জ্বল ছিলেন, আজও ঠিক তেমনই আছেন।
দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগীতে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করা এই শিল্পীর একক প্রদর্শনী ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’ ঘিরে দর্শকদের প্রবল উন্মাদনা দেখা গেছে। ৭০০ আসনবিশিষ্ট জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে কোনো আসনই খালি ছিল না। আয়োজকরা নিশ্চিত করেন, টিকিটের খবর ছড়িয়ে পড়ার প্রথম দিনেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ মঞ্চে উঠে রুনা লায়লা কালজয়ী দেশাত্মবোধক গান ‘দেশের জন্য যাঁরা’ দিয়ে পরিবেশনা শুরু করেন। এরপর একে একে পরিবেশন করেন ‘শিল্পী আমি’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানেরই খাতায়’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘আমায় গেঁথে দাও না’, ‘বন্ধু তিন দিন’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে’ এবং বহুল জনপ্রিয় ‘সাধের লাউ’। কেবল আধুনিক আর পপ গানেই থেমে থাকেননি, প্রথমবারের মতো মঞ্চে তিনি পরিবেশন করেন বিখ্যাত নজরুলসংগীত ‘ভুলিতে পারি না’। পরিশেষে, দর্শকসারির অজস্র অনুরোধে তাঁর চিরসবুজ গান ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে এই স্মরণীয় সুরসন্ধ্যার। প্রতিটি গানের পর দর্শকের অবিরাম করতালি প্রমাণ করে দেয়—যুগ পার হলেও রুনা লায়লার গানের জাদু আজও অবিকল ও চিরতরুণ।