খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 8শে ভাদ্র ১৪৩২ | ২৩ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানে থানায় হামলা ও কারাগার ভাঙচুরের সময় পুলিশের বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। সেই অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনও উদ্ধার হয়নি। অপরাধীদের হাতে এসব অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে—প্রমাণ মিলছে নানা ঘটনায়। একইভাবে কারাগার থেকে পালানো শত শত বন্দী এখনও অধরা। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রামে গত মে মাসে মো. পারভেজ ও রিয়াজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হওয়া রিভলবার ও গুলি উদ্ধার হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা জানান, এই অস্ত্র দিয়ে ছিনতাই ও লুটপাট করতেন। পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া অনেক আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি এখনও উদ্ধার হয়নি। এগুলো অপরাধীদের হাতে গেছে এবং অপরাধে ব্যবহার হচ্ছে। এ ছাড়া কারাগার থেকে পালানো সাত শতাধিক বন্দী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, লুট হওয়া অস্ত্রের বেশির ভাগই উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র-গুলি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো উদ্ধারে অভিযান চলছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গণ-অভ্যুত্থানে বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশ স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়। সেদিন ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২টি গুলি লুট হয়। এর মধ্যে ছিল রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান, কাঁদানে গ্যাস লঞ্চার ও বিভিন্ন বোরের গুলি।
২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে যৌথ অভিযান চালিয়ে চলতি বছরের ২৮ জুলাই পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৯০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩ লাখ ৯৪ হাজার ১১২টি গুলি উদ্ধার করা হয়। তবে এখনও ১ হাজার ৩৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭২০টি গুলি উদ্ধার হয়নি।
খুলনায় গত ৪ এপ্রিল ফারুক হোসেন ও খাইরুল সরদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, একটি শটগান ও সাতটি গুলি উদ্ধার হয়। পুলিশের দাবি, শটগান ও গুলির গায়ে লেখা ছিল ‘বিডি পুলিশ’—যা লুণ্ঠিত অস্ত্র।
চট্টগ্রামে গত ১৭ এপ্রিল আরিফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয় ডবলমুরিং থানার লুটের অস্ত্র-গুলি ছিনতাইয়ে ব্যবহারের অভিযোগে। ১৯ জুন জেলেপাড়া এলাকা থেকে সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে রেড মাসুমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে পাহাড়তলী থানার লুটের পিস্তল উদ্ধার হয়। পুলিশ জানায়, তিনি নগরীর বড় একটি সন্ত্রাসী চক্রের প্রধান।
এর আগে ১৭ জুন কাভার্ড ভ্যানচালক মো. রুবেলকে কোতোয়ালি থানার লুটের অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ৩ মার্চ সাতকানিয়ায় ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত নেজাম উদ্দিন ও সালেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাঁরা লুটের পিস্তল দিয়ে গুলি চালিয়েছিলেন। এছাড়া গত বছরের ৩০ নভেম্বর মুন্সিগঞ্জে শাহিদা আক্তার হত্যায় ওয়ারী থানার লুটের পিস্তল ব্যবহারের প্রমাণ মেলে।
কারা অধিদপ্তর জানায়, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে-পরে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে ২ হাজার ২৪০ বন্দী পালান এবং ৯৪টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল লুট হয়। এখনও ৭২১ জন পলাতক এবং ২০টি লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, এদের মধ্যে ৬৯ জন ঝুঁকিপূর্ণ—৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, ৯ জন জঙ্গি। পরিস্থিতি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তিনি মনে করেন, এতে আইনশৃঙ্খলা চরমভাবে অবনত হবে না।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, পুলিশের সব লুট হওয়া অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। অপরাধীদের হাতে এসব অস্ত্র থাকায় খুনখারাবি, ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বাড়ছে। থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে এবং পলাতক বন্দীদের ধরতে জাতীয় নির্বাচনের আগে জোরালো অভিযান চালানো প্রয়োজন। তা না হলে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যাবে।