খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ৫:১ পিএম
গুমোট গরম আর মাঝেমধ্যে নামা হালকা বৃষ্টির মধ্যে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গতকাল জড়ো হন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত শত শত প্রার্থী। দ্রুত পদায়নের দাবিতে তাঁদের এই অবস্থান কর্মসূচি সকাল থেকেই বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে। বেলা ১১টার দিকে আন্দোলন শুরু হলে পুলিশ সেখানে ব্যারিকেড দিলে টিএসসি অভিমুখী সড়কের একাংশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
তবে পুরো কর্মসূচিতে দেখা যায় ভিন্ন ও সৌহার্দ্যপূর্ণ এক দৃশ্য। আন্দোলনকারীরা শুরুতেই সেখানে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের হাতে ফুল তুলে দেন এবং জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে তাঁদের দাবি জানানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন। দুপুর গড়ালে প্রার্থীর সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে এবং মানুষের ভিড় শাহবাগ ছাড়িয়ে চারুকলা অনুষদের গেট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
রাজপথের এই আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন মুন্সিগঞ্জের সুইটি আক্তার শান্তা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শাহিনা আক্তার। শিশুদের ভালোবাসেন বলেই তারা দুজনই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে পদায়ন না হওয়ায় তাঁদের দিন কাটছিল গভীর অনিশ্চয়তায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ ফেব্রুয়ারি ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়েছিল। মার্চ মাসের মধ্যেই সব প্রার্থীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সনদ যাচাই কাজ শেষ হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও পদায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হচ্ছিল না।
নিয়োগপ্রাপ্তদের সূত্রে জানা যায়, চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর ১৭৫ দিন পার হয়ে গেলেও চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ মিলছিল না। এই দীর্ঘ ও অনিশ্চিত অপেক্ষায় থেকে অনেকেই মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। আন্দোলনকারীরা জানান, এই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে নির্বাচিত দুজন প্রার্থী ইন্তেকাল করেছেন। এর পাশাপাশি আরও অন্তত ১৫ জন প্রার্থীর মা-বাবা সন্তানের এই সরকারি শিক্ষকতায় যোগদানের আনন্দ দেখে যেতে পারেননি, তার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক প্রার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ার কোনো ধাপে যদি অনিয়ম থেকে থাকে, তার দায় কোনোভাবেই কষ্ট করে পাস করা সাধারণ প্রার্থীদের ওপর চাপানো যায় না। সব তথ্য যাচাই-বাছাই ও সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর মাসের পর মাস পদায়ন আটকে রাখার পেছনে কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না।
অবশেষে দুপুরের দিকে আন্দোলনস্থলে আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত সুসংবাদ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয় যে, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীরা আগামী ১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করবেন। পরবর্তীতে ৪ অক্টোবর তাঁদের চূড়ান্ত পদায়নের কাজ সম্পন্ন করা হবে।
পদায়নের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার খবর আন্দোলনস্থলে পৌঁছামাত্রই সবার মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। তরুণ এই শিক্ষকদের চোখে-মুখে ভেসে ওঠে স্বস্তির হাসি। তবে রাজপথ ছাড়ার আগে তাঁরা নাগরিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দেন। নিজেদের সঙ্গে আনা ঝাড়ু ও বস্তা হাতে নিয়ে আন্দোলনকারীরা শাহবাগের অবস্থানস্থলের সমস্ত আবর্জনা পরিষ্কার করে ফেলেন। দীর্ঘ ১৭৫ দিনের মানসিক টানাপোড়েন শেষে নির্দিষ্ট তারিখ পাওয়ার পর শান্তা, শাহিনা ও তাঁদের মতো হাজারো হবু শিক্ষক প্রশান্তির হাসি নিয়ে নিজ নিজ ঘরে ফেরেন।
মন্তব্য