কিউক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে একসঙ্গে ৩০টি ব্যাংকের এটিএম, ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম), পয়েন্ট অব সেল (পিওএস)সহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা সাময়িকভাবে সীমিত হয়েছে। রোববার (৪ অক্টোবর) রাত ৯টা থেকে এসব সেবায় বিঘ্ন শুরু হয়। ব্যাংকগুলোর দেওয়া বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত পরিস্থিতি চলতে পারে। তবে মাইগ্রেশনের কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হলে সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোও আগেভাগে স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে।
কিউক্যাশ নেটওয়ার্কের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো আধুনিকায়ন ও নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবেই এই সিস্টেম মাইগ্রেশন করা হচ্ছে। ফলে নেটওয়ার্কটির আওতাভুক্ত ব্যাংকগুলোর কিছু কার্ড ও ইলেকট্রনিক লেনদেন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীমিত রাখতে হয়েছে। তবে সব ব্যাংকের সব ধরনের সেবা একই সময়ে বন্ধ নেই। কোন ব্যাংকের কোন সেবা কতক্ষণ সীমিত থাকবে, তা ব্যাংকভেদে আলাদা।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও অসন্তোষের কথা জানা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী, ৩০টি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর সেবা একযোগে সীমিত করার আগে তাদের বিষয়টি অবহিত করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো নিজেদের উদ্যোগেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, নিরাপদ ও আধুনিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে কিউক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে ৩০টি ব্যাংকের কিছু সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। তবে ব্যাংকগুলো এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে আগে জানায়নি।
যেসব ব্যাংকের সেবা সীমিত
সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে সাময়িকভাবে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সীমিত হওয়া ব্যাংকগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বেসিক ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক আলফালাহ বাংলাদেশ, কমিউনিটি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও উরি ব্যাংক বাংলাদেশ।
ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের এসএমএসের মাধ্যমে সাময়িক সেবা বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টি জানিয়েছে। জরুরি লেনদেনের প্রয়োজন হলে বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
কোন সেবায় বেশি সমস্যা হতে পারে
কিউক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত এটিএম, সিআরএম ও পিওএস টার্মিনাল ব্যবহার করে লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহকরা সমস্যায় পড়তে পারেন। বিশেষ করে নগদ টাকা উত্তোলন, কার্ডের মাধ্যমে দোকানে কেনাকাটা কিংবা নির্দিষ্ট কার্ডভিত্তিক লেনদেনে সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে।
তবে সব কার্ড লেনদেন বন্ধ থাকবে—এমন নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ডেবিট কার্ডের কিছু লেনদেন স্বাভাবিক থাকার কথা রয়েছে। একইভাবে অন্য ব্যাংকের এটিএম ও পিওএস, বাংলা কিউআর এবং বিকাশ, নগদ ও উপায়ের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অনেক লেনদেন চালু থাকার কথা বলা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, গ্রাহকদের জন্য পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। বরং নির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত কিছু সেবা সাময়িকভাবে সীমিত হচ্ছে। কোন বিকল্পটি কার্যকর থাকবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও লেনদেনের ধরনটির ওপর।
গ্রাহকদের ভোগান্তির আশঙ্কা
ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, সফটওয়্যার আপগ্রেড কিংবা সিস্টেম মাইগ্রেশনের সময় কিছু সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা অস্বাভাবিক নয়। নতুন প্রযুক্তি সংযুক্ত করা, পুরোনো ব্যবস্থা থেকে আধুনিক প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর এবং নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করার মতো কাজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লেনদেন সীমিত করার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে এবার একসঙ্গে ৩০টি ব্যাংকের সেবা সীমিত হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব গ্রাহক নিয়মিত এটিএম থেকে নগদ টাকা তোলেন বা কার্ডের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক কেনাকাটা করেন, তাদের আগে থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখার প্রয়োজন হতে পারে।
জরুরি লেনদেনের ক্ষেত্রে অন্য ব্যাংকের এটিএম, সচল কার্ড সুবিধা, বাংলা কিউআর কিংবা মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করা যেতে পারে—যদি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই সুবিধা চালু থাকে। একই সঙ্গে লেনদেনের আগে ব্যাংকের এসএমএস, অ্যাপ বা গ্রাহকসেবা কেন্দ্র থেকে সংশ্লিষ্ট সেবাটি সচল আছে কি না জেনে নেওয়া নিরাপদ।
ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ হলে সেবাও আগেভাগে চালু হতে পারে। তবে মাইগ্রেশনের পুরো সময়জুড়ে কোন সেবা কখন চালু বা বন্ধ থাকবে, সে বিষয়ে ব্যাংকভেদে দেওয়া নির্দেশনাই গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হবে।
এই ঘটনায় একদিকে ব্যাংকিং প্রযুক্তির আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে, অন্যদিকে বড় পরিসরে সেবা সীমিত করার আগে গ্রাহক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যথাসময়ে অবহিত করার গুরুত্বও স্পষ্ট হয়েছে। ৩০টি ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের দৈনন্দিন লেনদেন স্বাভাবিক রাখতে তাই মাইগ্রেশন কার্যক্রম দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে শেষ করাই এখন প্রধান বিষয়।


