খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১ জুলাই ২০২৫
২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বের প্রধান কয়েকটি মুদ্রার বিপরীতে ১০ শতাংশের বেশি দর হারিয়েছে ডলার, যা ১৯৭৩ সালের পর সবচেয়ে বড় পতন। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রের ডলারকে সোনার মান থেকে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। এবারকার পতনের পেছনে আছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চমাত্রার শুল্কনীতি এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী পররাষ্ট্রনীতি।
মুদ্রাবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, শুল্ক আরোপ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ এবং ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ—এই তিনটি কারণ মিলেই ডলারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এতে করে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের প্রতি আস্থাও কমছে।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশ ভ্রমণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে সরকারের ঋণ সংগ্রহের প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে, রপ্তানিকারকদের জন্য দুর্বল ডলার কিছুটা উপকার বয়ে আনতে পারে।
কথা হচ্ছে, মুদ্রা দুর্বল হলে স্বাভাবিকভাবে এসব ঘটে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকির কারণে বাণিজ্যসংক্রান্ত এই ‘স্বাভাবিক’ বিষয়গুলোও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বিশ্বখ্যাত ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের জি-১০ বৈদেশিক মুদ্রা গবেষণা বিভাগের প্রধান স্টিভ ইংল্যান্ডার বলেন, ‘ডলার দুর্বল না শক্তিশালী—এই প্রশ্ন নয়; বরং এটি বলছে, বিশ্বের চোখে আপনার নীতিমালা কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।’
ট্রাম্প পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পর ডলার শক্তিশালী হয়েছিল। বিনিয়োগকারীরা তখন তাঁকে ব্যবসাবান্ধব মনে করেছিলেন। কিন্তু জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে ডলারের মূল্যহ্রাস শুরু হয়। শুরুর সেই আশাবাদিতা পরে রূপ নেয় স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হার নিয়ে উদ্বেগে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ট্রাম্প আকস্মিকভাবে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, যা প্রত্যাশার চেয়েও বহুগুণ বেশি। এতে করে মুদ্রাবাজার থেকে শুরু করে শেয়ারবাজার ও বন্ডবাজার পর্যন্ত একযোগে প্রতিক্রিয়া জানায়।
শুল্কের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ডলারে লেনদেন কমাবে—এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আমেরিকান বন্ড মার্কেটেও বিদেশি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
এছাড়া, মার্কিন সরকার যখন আরও বেশি ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, তখন ডলার ও সরকারি বন্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি এই পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করছে।
বিশ্ববিখ্যাত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরকের কর্মকর্তা রিক রিডার বলেন, ‘পুরোপুরি ডি-ডলারাইজেশন (ডলারের ওপর নির্ভরতা ত্যাগ) এখনো অনেক দূরে। তবে যেটি এই ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তুলছে, সেটি হলো—যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ।’
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও ডলার দুর্বল হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এখন ইউরোপীয় বা অন্যান্য বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। ইউরোপের স্টক্স ৬০০ সূচক এই সময়ের মধ্যে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। ডলারে রূপান্তর করলে এই বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় প্রায় ২৩ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দুর্বলতা একদিকে যেমন আমেরিকান অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে এটি ডলারের ‘নিরাপদ সম্পদ’ হিসেবে ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
খবরওয়ালা/এন