খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫
বাংলা কথাসাহিত্য ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক অনন্য নাম হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর জন্মদিন এলেই ফিরে আসে স্মৃতির ঝাঁপি—টেলিভিশনের পর্দা, আড্ডার শব্দ, বইয়ের পাতায় বোনা অদ্ভুত এক মায়াজগত ও বড় হওয়া দিনের বিস্ময়গুলো।
হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ার আগেই অনেকের মতো লেখকের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে তাঁর জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘এইসব দিনরাত্রি’–এর মাধ্যমে। তখনকার দিনে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ভিড় ছিল না; তাই নাটক মানেই ছিল পুরো পাড়ার সম্মিলিত অপেক্ষা। চরিত্রগুলো নিয়ে পাশের বাসার চাচিদের আড্ডা, হাসি আর তর্ক যেন নাটকটাকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পরিণত করত।
একান্নবর্তী পরিবারের গল্পটি একদিকে ছিল পরিচিত, আবার অন্যদিকে ছিল অসাধারণ। আনিস ভাইয়ের ম্যাজিক, রফিকের বোহেমিয়ান মায়া, ডলি জহুরের নির্লিপ্ত চা খাওয়া অথবা বুলবুল আহমেদের অসহায় কান্না—সবই দর্শকের মনে গেঁথে গেছে। টুনির মৃত্যুর পর স্কুলে বসে সবাই কান্নাভেজা চোখে সেই দৃশ্য নিয়ে আলোচনা করেছিল—এটাও আজো ভুলে যাওয়া যায় না।
লেখক হুমায়ূনকে আবিষ্কার আরও পরে—শঙ্খনীল কারাগার–এর মাধ্যমে। উপন্যাসের প্রথম বাক্যেই খুলে যায় বৃষ্টিভেজা মফস্বলের রহস্যময় রাত। মন্টু ও খোকার সাদামাটা অথচ বিষণ্ন দুনিয়া পাঠককে টেনে নেয় অচিরেই। শিরিনের চরিত্র মধ্যবিত্ত বয়ানের মধ্যে এনে দেয় ভিন্ন আঙ্গিক—শ্রেণি, প্রেমভাঙা হতাশা ও পরিবারের ভেতর অসম সম্পর্কের তীব্র বাস্তবতা।
বৃহন্নলা কিংবা জ্বীন–কফিল–এ হুমায়ূনের পরিবেশ তৈরির দক্ষতা তার শিখরে। মানুষের ভেতরকার ভয়, সামাজিক নিষেধ আর মানসিক সংকটের স্তরগুলো উন্মোচন করেন তিনি অসাধারণ সূক্ষ্মতায়। মিসির আলীর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ—শার্লক হোমসের মতোই—গল্পে আনে অন্যরকম বুদ্ধিবৃত্তিক আনন্দ।
হিমু তাঁর আরেক সৃষ্ট বিস্ময়—হলুদ পাঞ্জাবির দার্শনিক, যিনি যুক্তি অস্বীকার করেও সত্যের কাছাকাছি পৌঁছান অন্য পথ ধরে। সহজ কথায় গভীর জীবনদর্শন এবং মানুষের প্রতি নির্লিপ্ত অথচ তীব্র মায়া—হিমুকে আলাদা করে তোলে।
হুমায়ূনের চরিত্রগুলো কখনোই একরৈখিক নয়—অয়োময়ের ছোট মির্জার মতোই একজন মানুষ একই সঙ্গে সংবেদনশীল ও নিষ্ঠুর হতে পারে। এই বহুমাত্রিকতা তাঁর নিজের মধ্যেও ছিল—শিশুসুলভ কৌতূহল, তীক্ষ্ণ যুক্তিবোধ, মাঝে মাঝে অস্থিরতা, আবার অবিশ্বাস্য মায়াবন্ধন।
গদ্য, নাটক, সিনেমা—যে মাধ্যমেই কাজ করুন না কেন, হুমায়ূন আহমেদ নিজের পথ নিজেই তৈরি করেছেন। সমাজের অসংগতি তিনি কখনো হাসি-ঠাট্টায়, কখনো গা ছমছমে রহস্যে, আবার কখনো নির্মম বাস্তবতায় তুলে ধরেছেন।
এক কথায়—তাঁকে কোনো খোপে রাখা যায় না।
তিনি বাতাসের মতো—চারপাশে আছেন, অনুভবে ধরা দেন, কিন্তু কোনো ছাঁচে ধরা দেন না।
খবরওয়ালা/এসজে