খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই আগস্ট ২০২৬, ৬:৩০ পিএম
দেশের বাজারে অবৈধভাবে ছড়িয়ে পড়া একাধিক বিদেশি ত্বক ফর্সাকারী (ফেয়ারনেস) ক্রিমে ভয়াবহ মাত্রায় বিষাক্ত ভারী ধাতু মার্কারির (পারদ) উপস্থিতি শনাক্ত করেছে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। সংস্থাটির পরীক্ষাগারে পরিচালিত কেমিক্যাল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৮টি সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের প্রসাধনীতে বাংলাদেশ মানদণ্ডে অনুমোদিত সীমার চেয়ে বহু গুণ বেশি ক্ষতিকর মার্কারি রয়েছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ এসব প্রসাধনী বিক্রি, বিতরণ, মজুদ ও ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বিএসটিআই।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএসটিআই জানায়, বাজার থেকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে সংগৃহীত বিভিন্ন ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের নমুনা ল্যাবরেটরিতে বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগের তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ মান (বিডিএস-১৩৮২) অনুযায়ী প্রসাধনী পণ্যে মার্কারির সর্বোচ্চ সহনীয় বা গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১.০০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন)। তবে পরীক্ষাগারের ফলাফলে দেখা গেছে, কয়েকটি ব্র্যান্ডের ক্রিমে অনুমোদিত সীমার চেয়ে শত গুণেরও বেশি ঘনত্বের বিষাক্ত মার্কারি ব্যবহার করা হয়েছে।
বিএসটিআইয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিদেশি ফর্সাকারী ক্রিমের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঘটেছে। এসব ক্রিমের বড় অংশ বৈধ প্রক্রিয়ায় শুল্ক পরিশোধ করে কিংবা মান পরীক্ষা করিয়ে আমদানি হচ্ছে না। লাগেজ ব্যাগেজ কিংবা চোরাইপথে দেশে প্রবেশ করায় এগুলোর গুণগত মান ও সুরক্ষা যাচাই করা এতদিন সম্ভব হয়নি। এরই প্রেক্ষিতে সংস্থাটি ঝটিকা সার্ভিল্যান্স চালিয়ে ক্ষতিকর কসমেটিকসগুলো চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়।
যেসব ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে ক্ষতিকর বিষাক্ত মার্কারি পাওয়া গেছে, সেগুলোর বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
| প্রসাধনীর নাম | প্রস্তুতকারক কোম্পানি | প্রস্তুতকারক দেশ | মার্কারির পরিমাণ (পিপিএম) |
| চাঁদনি হোয়াইটেনিং ক্রিম | এস.জে. এন্টারপ্রাইজ | পাকিস্তান | ১২০.৩৯ |
| ডিউ বিউটি ক্রিম | ক্রিয়েটিভ কসমেটিকস | পাকিস্তান | ১২৩.৩৭ |
| নুর হোয়াইটেনিং ক্রিম | নুর এন্টারপ্রাইজ | পাকিস্তান | ৮২.৭৬ |
| নাভিয়া হোয়াইটেনিং ক্রিম | লোয়া ইন্টারন্যাশনাল | পাকিস্তান | ৭৯.৭০ |
| নাভিয়া বিউটি ক্রিম | লোয়া ইন্টারন্যাশনাল | পাকিস্তান | ৫৯.৮২ |
| নিউ ফেস বিউটি ক্রিম | কিউসিআই কোম্পানি | পাকিস্তান | ৪৪.৭২ |
| গৌরি বিউটি ক্রিম | গৌরি কসমেটিকস প্রাইভেট লিমিটেড | পাকিস্তান | ৫৬.৯৩ |
| ন্যাচারাল পার্ল স্কিন ক্রিম | জিএলডিজেবি (হারবিন) কসমেটিকস কোম্পানি | চীন | ৬৭.৪৯ |
বিষাক্ত এসব পণ্যের ব্যাপারে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বলেন, “জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। ভোক্তার শারীরিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত কসমেটিকস যারা আমদানি, উৎপাদন বা বিক্রির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তিনি আরও জানান, অনিবন্ধিত ও ভেজাল পণ্য রোধে বিএসটিআই নিয়মতান্ত্রিকভাবে নমুনা পরীক্ষা, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা কেনার আগে পণ্যের ওপর বিএসটিআইয়ের কিউআর কোড বা অনুমোদন লোগো যাচাই করে নেন এবং সন্দেহজনক কোনো পণ্যের তথ্য পেলে দ্রুত সংস্থাকে অবহিত করেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, মার্কারি মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও বিষাক্ত একটি উপাদান। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, পারদযুক্ত ক্রিম দীর্ঘদিন ত্বকে ব্যবহার করলে ত্বকের মেলানিন স্তর পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ত্বক অতিমাত্রায় পাতলা ও সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, যার থেকে স্থায়ী মেছতা, স্থায়ী অ্যালার্জি ও ক্যানসারের মতো ঝুঁকি বাড়ে।
ত্বকের গণ্ডি পেরিয়ে মার্কারি শরীরের রক্তে মিশে কিডনি বিকল করতে পারে এবং স্থায়ীভাবে স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে ব্যবহারকারীর স্মৃতিভ্রম, কাঁপুনি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হ্রাসের মতো জটিলতা দেখা দেয়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে রক্তের মাধ্যমে পারদ ভ্রূণে প্রবেশ করে অনাগত শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক গঠন ও মানসিক বিকাশ চিরতরে পঙ্গু করে দিতে পারে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিতর্কিত এসব পণ্য কেনাবেচা থেকে সবাইকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার অনুরোধ জানিয়েছে বিএসটিআই।
মন্তব্য