বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম স্মারক মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অনেক বীর সন্তান। সেই অমর ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে অমর একুশের প্রথম প্রহরে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নামে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানের সূচনা করেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদন
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ শুরু হয়। ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার ঠিক পরেই প্রথমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ মিনারের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা আন্দোলনের মহান বীরদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ভাষা শহীদদের স্মৃতি স্মরণ করেন।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও দেশের শান্তি-সমৃদ্ধি কামনায় আয়োজিত বিশেষ মোনাজাতে শরিক হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মণ্ডলী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং শহীদ মিনারে উপস্থিত হাজারো সাধারণ মানুষ ভক্তিভরে মোনাজাতে অংশ নেন।
মন্ত্রিসভা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের শ্রদ্ধা
প্রধানমন্ত্রীর একক শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষ হওয়ার পর তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য এবং তাঁর বিশেষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে পুনরায় শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর পরপরই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দলীয়ভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। একে একে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিদেশি কূটনীতিকরা ভাষা শহীদদের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানান।
নিচে অমর একুশের প্রথম প্রহরের সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি ও শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি সারণি দেওয়া হলো:
| পর্যায় | শ্রদ্ধা নিবেদনকারী | সময় (প্রায়) | আনুষঙ্গিক কার্যক্রম |
| প্রথম | রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন | ১২:০১ মিনিট | রাষ্ট্রীয় অভিবাদন ও পুষ্পস্তবক অর্পণ। |
| দ্বিতীয় | প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান | ১২:০৫ মিনিট | একক পুষ্পস্তবক অর্পণ ও নীরবতা পালন। |
| তৃতীয় | প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা | ১২:১০ মিনিট | যৌথ শ্রদ্ধা নিবেদন ও বিশেষ মোনাজাত। |
| চতুর্থ | বিএনপি ও অন্যান্য দল | ১২:২০ মিনিট | দলীয় পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শোভাযাত্রা। |
জনস্রোত ও সাংস্কৃতিক চেতনা
শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের জনস্রোত আজিমপুর কবরস্থান এবং শহীদ মিনারের আশপাশের এলাকায় বাড়তে থাকে। হাতে লাল-সূর্যের পতাকা এবং শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ ধারণ করে সর্বস্তরের মানুষ ধীরলয়ে গেয়ে উঠেন আব্দুল গাফফার চৌধুরীর সেই কালজয়ী গান— ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরে উল্লেখ করেন যে, একুশ কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে অমর একুশের আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। একুশের এই চেতনা কেবল ফেব্রুয়ারি মাসেই সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।



