মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন এক চরম ও বিস্ফোরক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনীর পক্ষ থেকে ইরানের অভ্যন্তরে সামরিক অভিযানের পর, তেহরান তার দ্বিতীয় দফার ভয়াবহ প্রতিশোধমূলক পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী সমন্বিতভাবে এই অপারেশন পরিচালনা করছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী, ইসরায়েলের বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র তেল আবিবসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আঘাত হেনেছে।
তেল আবিবে আতঙ্ক ও বিস্ফোরণ
তেহরানের পক্ষ থেকে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পশরা ছোড়া হলে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ সক্রিয় হয়ে ওঠে। তা সত্ত্বেও, তেল আবিবের আকাশসীমায় বেশ কয়েকটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশেপাশে আগুনের কুণ্ডলী দেখা গেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এই হামলাকে দশকের অন্যতম বৃহৎ সরাসরি আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আরব দেশগুলোতে হামলার নেপথ্য কারণ
ইরান কেবল ইসরায়েল নয়, বরং সেইসব আরব দেশগুলোর ওপরও হামলা চালাচ্ছে যারা মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিয়েছে অথবা অভিযানে পরোক্ষ সমর্থন জুগিয়েছে। তেহরানের সাফ বক্তব্য হলো, যারা ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে সহায়তা করবে, তাদের সকল স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা ইরানের বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য হবে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন তেহরানের মূল নিশানায় পরিণত হয়েছে।
নিচে সাম্প্রতিক হামলার লক্ষ্যবস্তু এবং এর সম্ভাব্য প্রভাবের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হলো:
| লক্ষ্যবস্তুর নাম/স্থান | দেশ | হামলার ধরন ও ফলাফল |
| তেল আবিব (রাজধানী) | ইসরায়েল | একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণ; জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা। |
| আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটি | সংযুক্ত আরব আমিরাত | ক্ষেপণাস্ত্র হামলা; একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। |
| আল-উদেইদ ঘাঁটি | কাতার | মার্কিন সামরিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ। |
| জর্ডান ও বাহরাইন | জর্ডান/বাহরাইন | মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের কাছাকাছি এবং কৌশলগত স্থানে আঘাত। |
| রিয়াদ ও কুয়েত | সৌদি/কুয়েত | বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ও সামরিক সতর্কতা জারি। |
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া
ইরানের এই ব্যাপকভিত্তিক প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন নিহত হওয়ার সংবাদটি নিশ্চিত করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার’। তারা সতর্ক করে বলেছে যে, যদি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়, তবে পরবর্তী আঘাত হবে আরও বেশি বিধ্বংসী।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের সুরক্ষায় অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ও বিমান মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি হামলা যদি অবিলম্বে বন্ধ না হয়, তবে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বিশ্ববাজার ও জ্বালানি তেলের সরবরাহে। বর্তমানে তেল আবিবসহ ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোতে উদ্ধার অভিযান ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।



