খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে রাজধানীর পুরান ঢাকার শতবর্ষী বাদামতলী ফলের বাজার এখন উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত। ইফতারে পুষ্টিকর ফলের আকাশচুম্বী চাহিদাকে কেন্দ্র করে এই ঐতিহ্যবাহী পাইকারি বাজারে প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার ফল কেনাবেচা হচ্ছে। দেশের বৃহত্তম এই ফলের আড়ত থেকে আমদানিকৃত এবং দেশি ফলের সিংহভাগ জোগান দেওয়া হয় সারা বাংলাদেশে।
বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত বাদামতলী ফলের বাজারের গোড়াপত্তন হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে, আনুমানিক ১৯৩৫ সালের দিকে। বর্তমানে এটি কেবল একটি বাজার নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বিশ্বের প্রায় ৪৬টি দেশ থেকে খেজুর, আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর এবং নাশপাতির মতো ফল এখানকার আমদানিকারকদের হাত ধরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আমদানিকৃত ফলের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এবং বাকি ৩০ শতাংশ ভারত থেকে স্থলপথে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাদামতলীতে পৌঁছায়। প্রতিদিন এখানে দুই থেকে তিন শতাধিক ফলের ট্রাক ও কন্টেইনার খালাস করা হয়।
রমজানে ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ হলো খেজুর। ব্যবসায়ীদের মতে, বছরের অন্যান্য ১১ মাসে যে পরিমাণ খেজুর বিক্রি হয়, তার চেয়ে বেশি বিক্রি হয় কেবল এই এক রমজানে। এবার বাজারে খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা চড়া হলেও কেনাবেচায় ভাটা পড়েনি। বিশেষ করে জিহাদি খেজুরের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫ থেকে ১০ কেজির কার্টনে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন জাতের খেজুরের দাম মানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হচ্ছে।
বাদামতলী বাজারে বর্তমান পাইকারি ফলের মূল্যতালিকা (৩ মার্চ):
| ফলের নাম ও ধরণ | ওজন/পরিমাণ | মূল্য (টাকা) |
| মেডজুল খেজুর | ৫ কেজি | ৫,৫০০ – ৭,০০০ |
| মরিয়ম খেজুর | ৫ কেজি | ৪,০০০ – ৫,০০০ |
| আজওয়া খেজুর | ৫ কেজি | ৩,০০০ – ৫,০০০ |
| মাবরুম খেজুর | ৫ কেজি | ৪,০০০ – ৫,০০০ |
| কালমি খেজুর | ৫ কেজি | ২,৫০০ – ৩,৫০০ |
| জিহাদি খেজুর | ১০ কেজি | ২,৭০০ |
| সুক্কারি খেজুর | ৩ কেজি | ১,৮০০ – ২,৪০০ |
| ডালিম/বেদানা | ১ কেজি | ৫২০ – ৫৬০ |
| স্ট্রবেরি | ১ কেজি | ৬০০ – ৭০০ |
| তরমুজ (দেশি) | ১ কেজি | ১০০ – ১২০ |
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সরজমিনে দেখা যায়, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে আহসান মঞ্জিল পর্যন্ত পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য। রাস্তার এক পাশে কার্ভাড ভ্যান থেকে কার্টন নামানোর ব্যস্ততা, অন্য পাশে আড়তগুলোতে চলছে নিলামের হাঁকডাক। নিয়মিত ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কয়েক হাজার মৌসুমি ব্যবসায়ীও এই বাজারে সক্রিয় হয়েছেন। খুচরা বাজারের তুলনায় দাম কিছুটা কম এবং একসঙ্গে অনেক বৈচিত্র্যময় ফল পাওয়া যায় বলে সাধারণ ক্রেতারাও ভিড় জমাচ্ছেন এখানে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা পাইকারি ক্রেতা মো. নয়ন মিয়া জানান, দেশি ফলের দামও এবার বেশ বাড়তি। পেঁপে ১৭০–১৮০ টাকা এবং কুল ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে দাম বেশি হলেও চাহিদার কারণে ব্যবসায়ীরা লোকসানের আশঙ্কায় নেই।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ৩৭ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হাজী মোহাম্মদ ফরহাদ রানা বলেন, বাদামতলী থেকে সরকার প্রতি বছর শতকোটি টাকা রাজস্ব পায়। এই বাজারকে আধুনিকায়ন করা এবং যানজটমুক্ত রাখা জরুরি। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, নতুন সরকার যদি দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
ফলের গুণগত মান নিশ্চিত করতে বাজার কর্তৃপক্ষ কঠোর নিয়ম জারি করেছে। ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, পচা বা মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর বিক্রি এখানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতে খেজুর সরাসরি মেঝেতে না রেখে কাঠের তক্তা বা চাটাইয়ের ওপর রাখা এবং প্রতিটি বিক্রির মেমো সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শত বছরের ঐতিহ্য আর প্রতিদিনের শতকোটি টাকার কর্মযজ্ঞ বাদামতলীকে কেবল ঢাকা নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল বিপণন কেন্দ্রে পরিণত করেছে।