সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাজধানীতে জমকালো আলোকসজ্জা

বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। গত ৮ মার্চ (রবিবার) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে শপিং মল, বিপণিবিতান এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা না করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করা হয়। তবে রাজধানীর বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সরকারি এই কৃচ্ছ্রসাধন নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঢাকার প্রধান প্রধান শপিং মলগুলো এখনও আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে।

রাজধানীর বিপণিবিতানগুলোর বাস্তব চিত্র

সরেজমিনে গত রবি ও সোমবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বড় শপিং মল ও বাণিজ্যিক ভবনে আলোকসজ্জা কমানোর কোনো লক্ষণ নেই। মৌচাক এলাকার ‘ফরচুন শপিং কমপ্লেক্স’ এবং ‘সেন্টার পয়েন্ট শপিং মল’ ভবনজুড়ে বর্ণিল বাতি জ্বালিয়ে রেখেছে। সেন্টার পয়েন্ট শপিং মলের দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা এ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি। তবে তারা জানিয়েছেন, নির্দেশনা হাতে পেলে তা কার্যকর করবেন।

নিউমার্কেট এবং গাউছিয়া এলাকার চিত্র আরও ভয়াবহ। আসন্ন ধর্মীয় উৎসব ও ঈদকে কেন্দ্র করে এসব এলাকায় আলোকসজ্জার ধুম পড়েছে। গাউছিয়া মার্কেটের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় তারা বাতি লাগিয়েছেন এবং সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা তাদের কানে পৌঁছায়নি। অন্যদিকে, ‘মক্কা শপিং মল’ কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে যে ডিপিডিসির কর্মকর্তারা এসে তাদের সতর্ক করে গেছেন, তবুও তারা অন্যান্য মার্কেটের দোহাই দিয়ে আলোকসজ্জা অব্যাহত রেখেছে।

জ্বালানি সংকট ও সরকারি নির্দেশনার প্রেক্ষাপট

জ্বালানি মন্ত্রণালয় মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমাতে এবং লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান সংকটের গভীরতা বুঝতে নিচের সারণিটি সহায়ক হতে পারে:

বিষয়ের বিবরণ সরকারি নির্দেশনা ও বর্তমান অবস্থা
মূল লক্ষ্য জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো এবং জ্বালানি সাশ্রয়।
নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্র শপিং মল, বিপণিবিতান, অফিস ভবন ও সামাজিক অনুষ্ঠান।
কার্যকরী তারিখ ৮ মার্চ ২০২৬ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত।
তদারকি সংস্থা ডিপিডিসি, ডেসকো এবং বিদ্যুৎ বিভাগের মোবাইল কোর্ট।
বাস্তব পরিস্থিতি মৌচাক, নিউমার্কেট ও গাউছিয়ায় ব্যাপক আলোকসজ্জা বিদ্যমান।

ব্যবসায়ী সংগঠন ও প্রশাসনের বক্তব্য

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সমিতি থেকে সব মার্কেটকে নির্দেশনা দেওয়া হলেও অনেকেই তা মানছেন না। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি মানের বিপণিবিতানগুলো নিজেদের মতো করে আলোকসজ্জা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এর জন্য নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকি এবং প্রয়োজনে জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে।

এদিকে, বিদ্যুৎ বিভাগ বসে নেই। সোমবার রাতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ করতে মোবাইল কোর্টের অভিযান শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বাতি নিভিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং অবাধ্যদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন।

উপসংহার

জাতীয় স্বার্থে বিদ্যুৎ সাশ্রয় এখন সময়ের দাবি। ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় উৎসবের আমেজ প্রয়োজন থাকলেও দেশের সামগ্রিক জ্বালানি পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। প্রশাসনের কঠোর তদারকি এবং ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে। অন্যথায়, এই অপচয় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।