ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র উভচর যুদ্ধজাহাজ, মেরিন ইউনিট এবং অতিরিক্ত কয়েক হাজার সেনা এই অঞ্চলে মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে, বিশেষ করে সম্ভাব্য বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কায়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ইরানে সরাসরি স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে ভবিষ্যৎ যেকোনো সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুতি বাড়াতে এই মোতায়েনকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রয়োজন হলে স্থল ও সমুদ্র—উভয় ক্ষেত্রেই অভিযান চালানো সহজ হবে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো উভচর আক্রমণ সক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস বক্সার’-এর নেতৃত্বে একটি মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটের মোতায়েন। এই ইউনিটের সঙ্গে থাকা অন্যান্য জাহাজ ও বিমান ব্যবস্থা একত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ সক্ষমতা তৈরি করে। প্রতিটি মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটে সাধারণত প্রায় ২,৫০০ সদস্য থাকে, যারা সমুদ্রপথে দ্রুত অভিযান পরিচালনা, আকাশ থেকে হামলা এবং স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণে দক্ষ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই অতিরিক্ত সেনাদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে তাদের আগাম মোতায়েন ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে চাইছে। জানা গেছে, এই বাহিনী নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। নতুন করে মোতায়েন সম্পন্ন হলে এই সংখ্যা আরও বাড়বে এবং মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়াবে দুইয়ে। এর ফলে অঞ্চলে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
নিচের সারণিতে বর্তমান ও সম্ভাব্য মোতায়েন পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
| উপাদান |
বর্তমান অবস্থা |
নতুন মোতায়েনের পর |
| মোট মার্কিন সেনা |
প্রায় ৫০,০০০ |
বৃদ্ধি পাবে |
| মেরিন ইউনিট সংখ্যা |
১ |
২ |
| প্রতি ইউনিটে সদস্য |
~২,৫০০ |
অপরিবর্তিত |
| প্রধান যুদ্ধজাহাজ |
সীমিত উপস্থিতি |
‘ইউএসএস বক্সার’সহ বৃদ্ধি |
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের পেছনে কয়েকটি কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র খারগ দ্বীপের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করা। এই দ্বীপ থেকে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত হয়, ফলে এর নিয়ন্ত্রণ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক সম্ভাব্য বৃহৎ স্থলযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও প্রকাশ্যে সরাসরি সেনা পাঠানোর বিষয়টি অস্বীকার করলেও প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত গোপন রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক জোরদার উপস্থিতি কেবল তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা কৌশল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।