খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আকাশপথের লড়াই এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্রকে অপরাজেয় মনে করা হলেও, ইরানের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখে মার্কিন বিমানবাহিনী যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তা বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশ্লেষকদের অবাক করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই রণক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথের একচ্ছত্র আধিপত্য এখন চরম চ্যালেঞ্জের মুখে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এবং দ্য গার্ডিয়ানের তথ্যমতে, ৩ এপ্রিলের সংঘাত মার্কিন বাহিনীর জন্য ছিল অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ওই দিন ইরানের আকাশসীমায় একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, বিমানটির দুই ক্রুর মধ্যে একজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অন্যজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
একই সময়ে একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২ আক্রমণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিধ্বস্ত বিমানের পাইলটকে উদ্ধারের জন্য পরিচালিত বিশেষ অভিযানে মার্কিন হেলিকপ্টারগুলোও ইরানি বাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইরানের রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা সক্রিয় এবং নির্ভুল।
এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ড্রোন বা চালকবিহীন বিমান খাতে। নজরদারি এবং নির্ভুল হামলার জন্য পরিচিত এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনগুলো একের পর এক ভূপাতিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০টির বেশি রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। ইরানের ইলেকট্রনিক জ্যামিং এবং সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (SAM) প্রযুক্তির কাছে এই ব্যয়বহুল ড্রোনগুলো কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছে।
নিচে মার্কিন বিমান বাহিনীর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
সারণি: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে মার্কিন এয়ারক্রাফটের আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতি
| এয়ারক্রাফটের ধরন | সংখ্যা (নিশ্চিত ও সম্ভাব্য) | আনুমানিক একক মূল্য (ইউএস ডলার) | বর্তমান অবস্থা |
| এমকিউ-৯ রিপার (ড্রোন) | ১০+ | ৩০ মিলিয়ন | ভূপাতিত/বিধ্বস্ত |
| এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল | ২-৩ | ৮০-১০০ মিলিয়ন | ভূপাতিত |
| এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২ | ১ | ২৫-৩০ মিলিয়ন | বিধ্বস্ত |
| কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার | ১ | ৯০-১০০ মিলিয়ন | দুর্ঘটনায় ধ্বংস |
| অন্যান্য (হেলিকপ্টার ও ছোট ড্রোন) | ৩-৫ | পরিবর্তনশীল | ক্ষতিগ্রস্ত/ভূপাতিত |
এই ক্ষয়ক্ষতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র কেবল সামরিকভাবে নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবেও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের মূল্য প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এর সাথে রয়েছে কেসি-১৩৫-এর মতো স্ট্র্যাটেজিক রিফুয়েলিং বিমান হারানোর ক্ষতি, যা আকাশে দীর্ঘক্ষণ অপারেশন চালানোর সক্ষমতাকে হ্রাস করে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতে, এই যুদ্ধের আর্থিক ক্ষতি ইতিমধেই কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো তাদের মাল্টি-লেয়ারড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। মোবাইল এয়ার ডিফেন্স ইউনিটগুলো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করতে সক্ষম হওয়ায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে ড্রোনের মতো ধীরগতির লক্ষ্যবস্তুগুলোকে ইরান খুব সহজেই তাদের রাডার নেটওয়ার্কে বন্দি করছে।
ইরানের সাথে এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি তিক্ত শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তিতে হাজার গুণ এগিয়ে থাকলেও, একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তির সুসংগঠিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আকাশপথে বিজয় অর্জন করা যে কতটা কঠিন, তা এখন স্পষ্ট। মিত্রপক্ষের ভুল আক্রমণ বা ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ এবং যান্ত্রিক ত্রুটির মতো ঘটনাগুলো মার্কিন অপারেশনাল সমন্বয়হীনতাকেও প্রকট করে তুলেছে। সামগ্রিকভাবে, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘এয়ার সুপ্রিমেসি’ বা আকাশ আধিপত্যের দীর্ঘদিনের দম্ভকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।