খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী (রহ.) মাজারসংলগ্ন দিঘিতে একটি কুকুরকে কুমিরের টেনে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা, বিভ্রান্তি ও নানা ধরনের দাবি-প্রতিদাবির জন্ম হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিও ঘিরে একদিকে যেমন পরিকল্পিতভাবে প্রাণী হত্যার অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এটিকে একটি আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রশাসনিক তদন্ত, ময়নাতদন্ত এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পর্যন্ত গড়িয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার বিকেলে মাজারের দক্ষিণ দিঘির প্রধান ঘাট এলাকায়। তখন সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। হঠাৎ করে একটি কুকুর নারীদের ঘাট দিক থেকে দৌড়ে এসে প্রথমে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তিকে কামড় দেয় এবং পরে আশপাশের লোকজনের দিকেও আক্রমণাত্মক আচরণ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কুকুরটি দিঘির পানির দিকে নেমে যায়। ঠিক তখনই দিঘিতে থাকা একটি কুমির—স্থানীয়ভাবে ‘ধলা পাহাড়’ নামে পরিচিত—কুকুরটিকে টেনে পানির নিচে নিয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রায় ৫৬ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, কুকুরটি দিঘির কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে এবং মুহূর্তের মধ্যে কুমিরটি পানির গভীর থেকে উঠে এসে সেটিকে টেনে নিয়ে যায়। ভিডিওটি নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যা তৈরি হলেও স্থানীয়দের দাবি, এটি কোনো পরিকল্পিত ঘটনা নয়, বরং তাৎক্ষণিক পরিস্থিতির ফল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, ঘটনার আগে কুকুরটি কয়েকজনকে কামড় দেয় এবং একটি শিশুকেও আঘাত করে। ফলে এলাকাজুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
দিঘি সংলগ্ন দোকানি বিনা আক্তার জানান, কুকুরটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সমস্যা সৃষ্টি করছিল। তার দাবি, এটি শুধু মানুষ নয়, কয়েকটি পোষা প্রাণীকেও আক্রমণ করেছে। ঘটনার দিনও এটি হঠাৎ করেই উগ্র আচরণ শুরু করে।
অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে কুমির পরিচর্যার সঙ্গে যুক্ত মেহেদী হাসান (তপু) বলেন, কুমিরটি সম্প্রতি ডিম পাড়ার পর তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে। তার মতে, ঘটনাস্থলে অনেক মানুষ থাকলেও কেউ কুকুরটিকে কুমিরের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি নেয়নি।
মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো অনেক তথ্যই বিভ্রান্তিকর। তিনি দাবি করেন, কুকুরটিকে পরিকল্পিতভাবে কুমিরের সামনে দেওয়া হয়নি। বরং অসুস্থ ও আক্রমণাত্মক একটি কুকুর হঠাৎ দিঘিতে নেমে পড়ার কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।
তিনি আরও জানান, ঘটনাটিকে ঘিরে অপপ্রচার ও ভুল তথ্য ছড়ানোর কারণে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
ঘটনার পর বাগেরহাট জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিয়া খাতুনকে। কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ করছে।
এছাড়া প্রাণিসম্পদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে কুকুরটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। নমুনা সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সিডিআইএল) পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিবেদন এলে কুকুরটি জলাতঙ্ক বা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত ছিল কি না, তা জানা যাবে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| স্থান | খানজাহান আলী (রহ.) মাজার দিঘি, বাগেরহাট |
| ঘটনা | কুকুরকে কুমির টেনে নিয়ে যাওয়া |
| সময় | বুধবার বিকেল |
| কুমিরের পরিচিত নাম | ধলা পাহাড় |
| তদন্ত কমিটি | ৩ সদস্য, প্রধান ইউএনও আতিয়া খাতুন |
| ময়নাতদন্ত | সম্পন্ন, রিপোর্ট অপেক্ষমাণ |
| আইনগত পদক্ষেপ | থানায় জিডি করা হয়েছে |
জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, দিঘিতে কুমিরকে জীবন্ত প্রাণী খাওয়ানোর কোনো প্রথা বা নির্দেশনা নেই। তিনি জানান, কিছু ক্ষেত্রে দর্শনার্থীরা মুরগি পানিতে ছুড়ে দেন, তবে তা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতায়। ভিডিও দেখে একাধিক ব্যাখ্যা তৈরি হওয়ায় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে মাজার এলাকায় প্রাণী ব্যবস্থাপনা, দর্শনার্থীর নিরাপত্তা এবং দিঘির পরিবেশ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সব মিলিয়ে, খানজাহান আলী মাজারের এই ঘটনা এখন শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনিক তদন্ত, জনমত ও ডিজিটাল তথ্য প্রবাহের প্রভাব—এই তিনটি দিক থেকেই জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।