খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রায় দেড় মাস বিরতির পর আবারও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজারে অতিরিক্ত ডলার সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অংশ হিসেবে বুধবার (১৫ এপ্রিল) একক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭ কোটি মার্কিন ডলার বা ৭০ মিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলার সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় এই পদক্ষেপকে বাজার ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই ডলার ক্রয় সম্পন্ন করা হয় মাল্টিপল প্রাইস অকশন (এমপিএ) পদ্ধতির মাধ্যমে। এই পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলোর দরপত্রের ভিত্তিতে সর্বোত্তম মূল্য নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ লেনদেনে প্রতি ডলারের এক্সচেঞ্জ রেট এবং কাট-অফ রেট উভয়ই নির্ধারিত হয় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। এর আগে ২ মার্চ কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছিল, যেখানে কাট-অফ রেট ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। ফলে দেড় মাসের ব্যবধানে ডলার ক্রয়ের দামে সামান্য ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের বর্তমান চাহিদা-সরবরাহ পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করছে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে মোট ৫৫৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার (প্রায় ৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার) ক্রয় করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় এই পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি, যা ইঙ্গিত দেয় যে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে এসেছে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা একক মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এই অঙ্ক ৪৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
এছাড়া এপ্রিলের প্রথম ১৪ দিনেই এসেছে ১৬০ কোটি ৭০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ২,৭৮১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.৬ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
নিচে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো তুলে ধরা হলো—
| সূচক | পরিমাণ |
|---|---|
| মার্চ মাসে রেমিট্যান্স | ৩৭৫.৫০ কোটি ডলার (রেকর্ড) |
| এপ্রিল (১–১৪ দিন) | ১৬০.৭০ কোটি ডলার |
| জুলাই–১৪ এপ্রিল মোট রেমিট্যান্স | ২,৭৮১ কোটি ডলার |
| বার্ষিক প্রবৃদ্ধি | ২০.৬ শতাংশ |
| গ্রস রিজার্ভ | ৩৪.৮৭ বিলিয়ন ডলার |
| BPM-6 অনুযায়ী রিজার্ভ | ৩০.২০ বিলিয়ন ডলার |
| সর্বশেষ ডলার ক্রয় | ৭০ মিলিয়ন ডলার |
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি, প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং চ্যানেলকে আরও সহজলভ্য করার কারণে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত ডলার জমা হচ্ছে, যার একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্রয় করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ধরনের ডলার ক্রয় সাধারণত তখনই করা হয় যখন বাজারে ডলার সরবরাহ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। এতে বাজারে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকে।
বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৮৭ বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফের বিপিএম-৬ মান অনুযায়ী নিট রিজার্ভ ৩০.২০ বিলিয়ন ডলার। এই অবস্থান আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক দেনা পরিশোধে স্বস্তি দিলেও জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্প কাঁচামালের উচ্চ আমদানি চাহিদা এখনো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ যদি এই ধারা বজায় রাখে, তাহলে ডলার বাজার আরও স্থিতিশীল হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বৈদেশিক আয়ের উৎস বহুমুখীকরণ জরুরি।
সব মিলিয়ে দেড় মাস পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ক্রয় আবারও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ধীরে ধীরে ভারসাম্যের দিকে এগোচ্ছে, যদিও অর্থনীতির কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো এখনো পুরোপুরি কাটেনি।