খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
লেবাননে চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ১৬৭ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৭ হাজার ৬১ জন। পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করলেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে গত ২ মার্চ থেকে, যখন লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হয়। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা চালায় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। সেই ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বিস্তৃত হয় এবং লেবানন সরাসরি সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক মাসের এই সংঘাতে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনা হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় পরিস্থিতি মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে সাড়ে ৩ লাখের বেশি শিশু রয়েছে, যা সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর বড় অংশই অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি দ্রুত বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
| সূচক | সংখ্যা |
|---|---|
| নিহত | ২,১৬৭ জন |
| আহত | ৭,০৬১ জন |
| বাস্তুচ্যুত | প্রায় ১২ লাখ |
| বাস্তুচ্যুত শিশু | ৩.৫ লাখের বেশি |
হিজবুল্লাহর মুখপাত্র ও লেবাননের পার্লামেন্ট সদস্য ইব্রাহিম মুসাবি জানিয়েছেন, ইরান এবং আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় শিগগিরই একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমানে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ইতিবাচক দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
লেবাননের শীর্ষস্থানীয় দুই সরকারি কর্মকর্তা আলজাজিরাকে নিশ্চিত করেছেন যে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আলোচনা চলছে, তবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা শর্ত চূড়ান্ত হয়নি।
তারা আরও জানিয়েছেন, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ও কার্যকারিতা আংশিকভাবে নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার গতিপ্রকৃতির ওপর। অর্থাৎ আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তিগুলোর সম্পর্কের উন্নতি বা অবনতির সঙ্গে লেবাননের পরিস্থিতি সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননের বর্তমান সংকট শুধুমাত্র স্থানীয় নয়, বরং এটি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়াও বাড়ছে, যা সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
যদিও যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছে, তবুও বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। কূটনৈতিক মহল মনে করছে, আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার অভাবই প্রধান বাধা।
একাধিক সূত্রের মতে, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়িত হলেও তা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।
বর্তমান পরিস্থিতিতে লেবাননের সাধারণ জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি একত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবিক সংস্থা দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, বিলম্ব হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে লেবাননে চলমান সংঘাত এখন একদিকে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক উদ্যোগ নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে বাস্তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমঝোতার ওপর।