হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় দুই শিশুর পায়ে শিকল বেঁধে মাদরাসায় রাখার একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার, শিশু সুরক্ষা এবং অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে এই ঘটনা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে চুনারুঘাট উপজেলার একটি বাজার এলাকায় দুই শিশুকে পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় চলাফেরা করতে দেখা যায়। মাথায় টুপি ও গায়ে পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় তাদের ধীরগতিতে হাঁটতে দেখে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। পরে তারা বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তরে নিয়ে যান।
ইউএনওর নির্দেশে দ্রুত শিকল কেটে শিশু দুটিকে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক ভাইরাল হয় এবং দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
শিশুদের পরিচয় ও পারিবারিক তথ্য
ভুক্তভোগী দুই শিশু হলো—
- মারুফ ইসলাম সবুজ (৯), হবিগঞ্জ সদর উপজেলার চাঁনপুর গ্রামের মফিজুল ইসলামের ছেলে
- সায়েম মিয়া (৮), বানিয়াচং উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের বেলু মিয়ার ছেলে
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের চুনারুঘাট উপজেলার একটি হেফজখানা ও আবাসিক মাদরাসায় ভর্তি করা হয়েছিল।
ঘটনার পটভূমি ও অভিযোগ
পরিবারের দাবি, শিশু দুজন নিয়মিতভাবে মাদরাসা থেকে পালিয়ে বাড়ি চলে যেত। এতে অভিভাবকরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। পরে গত কয়েকদিন আগে তারা প্রায় ৪০০ টাকা দিয়ে বাজার থেকে একটি শিকল কিনে এনে শিশুদের পায়ে বেঁধে মাদরাসায় রেখে যান।
পরিবারের ধারণা ছিল, এতে তারা পালাতে পারবে না এবং নিয়মিত পড়াশোনা করবে। কিন্তু মঙ্গলবার বিকেলে সুযোগ পেয়ে শিশুরা শিকল কেটে ফেলার চেষ্টা করে এবং বাজারের দিকে চলে যায়। সেখানেই স্থানীয়দের নজরে পড়ে তারা।
ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষেপ
| সময়/পর্যায় |
ঘটনা |
| কিছুদিন আগে |
পরিবার শিকল কিনে শিশুদের পায়ে বাঁধে |
| ২১ এপ্রিল দুপুর |
শিশুরা শিকলসহ বাজারে দেখা যায় |
| দুপুর পরবর্তী সময় |
স্থানীয়রা ইউএনও অফিসে নিয়ে যায় |
| পরে |
শিকল কেটে থানায় হস্তান্তর |
| বিকেল |
শিশুদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয় |
প্রশাসনের বক্তব্য
চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী জানান, বিষয়টি জানার পর স্থানীয়রা শিশু দুজনকে উপজেলা পরিষদে নিয়ে আসে। পরে মানবিক বিবেচনায় তাদের শিকল খুলে থানায় পাঠানো হয় এবং পরবর্তীতে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, “পরিবারের পরামর্শ অনুযায়ীই শিশুদের পায়ে শিকল পরানো হয়েছিল বলে জানা গেছে। বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি।”
সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই এটিকে শিশু অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে শিক্ষার নামে শারীরিক শাস্তি ও শৃঙ্খলার এমন চরম রূপ ব্যবহারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো অবস্থাতেই শিশুকে শারীরিকভাবে শৃঙ্খলিত করা আইনত ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শিশুর মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশ্লেষণ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং গ্রামীণ সমাজে শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতার অভাবের প্রতিফলন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
উপসংহার
চুনারুঘাটের এই ঘটনা আবারও শিশু সুরক্ষা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং শিক্ষাব্যবস্থার মানবিক দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি আরও তদন্ত করা হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।