খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এক সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘুস বাণিজ্যের সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিটি পাসপোর্ট অফিসে ‘চ্যানেল মাস্টার’ নামক বিশেষ কর্মকর্তা বা কর্মচারীর মাধ্যমে এই বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ সংগ্রহ, হিসাবরক্ষণ ও বণ্টন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মাঠ পর্যায়ের সাধারণ কর্মচারী থেকে শুরু করে কার্যালয় প্রধান, এমনকি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে। সংগৃহীত ঘুসের একটি বড় অংশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের প্রভাবশালী মহল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্য এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে পৌঁছায় বলে অনুসন্ধানী সূত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা এই অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিনব কৌশল ফাঁস করেন। তিনি জানান, এই ঘুস বাণিজ্য বন্ধ করা অত্যন্ত দূরূহ, কারণ এর মূল শিকড় খোদ অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কতিপয় কর্মকর্তা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থার মাঠ পর্যায়ের অসাধু সদস্য এবং ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারাও এই অবৈধ আয়ের নিয়মিত অংশীদার।
পাসপোর্ট অফিসগুলোর ঘুস বাণিজ্যের অঙ্ক মূলত নির্ধারিত হয় সেখানে প্রতিদিন জমা পড়া মোট আবেদনের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট পাসপোর্ট আবেদনের প্রায় ৮০ শতাংশই জমা পড়ে বিশেষ ‘দালাল চ্যানেল’-এর মাধ্যমে। এসব আবেদনের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি-এর অতিরিক্ত হিসেবে আবেদনকারী প্রতি ১,৫০০ টাকা থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত ‘চ্যানেল খরচ’ বা ঘুস আদায় করা হয়।
দালালদের মাধ্যমে আসা এই বিশেষ চিহ্নযুক্ত আবেদনপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করা, ঘুসের টাকা সংগ্রহ করা এবং তা নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভাগবাঁটোয়ারা করার জন্য প্রতিটি অফিসে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিয়োজিত থাকেন, যাকে অভ্যন্তরীণ ভাষায় ‘চ্যানেল মাস্টার’ বলা হয়। সাধারণত কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক বা উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) পদমর্যাদার কর্মচারীরা এই স্পর্শকাতর দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ৬৯টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস রয়েছে। দৈনিক আবেদন জমা পড়ার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই অফিসগুলোকে মূলত ‘এ’, ‘বি’ এবং ‘সি’—এই তিনটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই শ্রেণিবিন্যাস মূলত কর্মকর্তাদের লাভজনক কর্মস্থলে পদায়নের (পোস্টিং বাণিজ্য) ক্ষেত্রে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিচে ক্যাটাগরিভিত্তিক অফিস সংখ্যা, দৈনিক আবেদনের হার এবং আনুমানিক ঘুসের আয়ের একটি তুলনামূলক বিবরণ দেওয়া হলো:
| অফিসের ক্যাটাগরি | মোট অফিস সংখ্যা | দৈনিক আবেদন জমার সংখ্যা | সর্বনিম্ন দৈনিক ঘুস (৮০% দালাল চ্যানেল) | আনুমানিক মাসিক ঘুসের পরিমাণ |
|
ক্যাটাগরি ‘এ’ (ব্যাপক ঘুসপ্রবণ) |
৩৩টি | ২০০ থেকে ২৫০টি (কিংবা ১,০০০ – ১,৫০০টি) | ৪০০,০০০+ টাকা | ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত |
| ক্যাটাগরি ‘বি’ | ২৪টি | ১০০ থেকে ১৯৯টি | ৮০,০০০ – ১৫০,০০০ টাকা | ১৬ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা |
| ক্যাটাগরি ‘সি’ | ১২টি | ১০০টির নিচে | ৮০,০০০ টাকা (গড়) | ২০ লাখ টাকা (ন্যূনতম) |
একটি সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন বা ‘সি’ ক্যাটাগরির কোনো অফিসে যদি দৈনিক ১০০টি আবেদন জমা পড়ে, তবে তার ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ৮০টি আবেদন আসে দালালদের মাধ্যমে। প্রতি আবেদনে সর্বনিম্ন ১,৫০০ টাকা ঘুস ধরা হলে দৈনিক ঘুসের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সপ্তাহের ৫ কর্মদিবসে তা প্রায় ৬ লাখ টাকা এবং মাসে ২০ লাখ টাকায় পৌঁছায়। অন্যদিকে, ‘এ’ ক্যাটাগরির বড় অফিসগুলোতে যেখানে দৈনিক ১,০০০ থেকে ১,৫০০ আবেদন জমা পড়ে, সেখানে সপ্তাহে ঘুসের পরিমাণ ৪০ লাখ টাকা এবং মাসে প্রায় দেড় কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরে এই ঘুস বাণিজ্যকে একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বদলি বা দাপ্তরিক সভার অজুহাতে নিয়মিত ঢাকার আগারগাঁওয়ের প্রধান কার্যালয়ে আসেন এবং ক্ষমতাধর পরিচালক ও উপপরিচালকদের টেবিলে ‘ঘুসের খাম’ বা বিশেষ প্যাকেট পৌঁছে দেন। গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে অনেক সময় কর্মকর্তাদের বাসভবনেও এই টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়। এছাড়া নামসর্বস্ব কিছু পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি এবং মাঠ পর্যায়ের অসাধু লাইনম্যানরাও এই টাকার ভাগ পান।
খাতওয়ারি বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাসপোর্ট অফিসগুলোতে মূলত ১০টি সুনির্দিষ্ট খাতে ঘুস নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রধান খাতগুলো হলো:
নতুন আবেদনপত্র জমা (১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা)
আবেদনপত্রের তথ্য সংশোধন (সমস্যার গভীরতা অনুযায়ী নির্ধারিত ভলিউম)
পূর্বনির্ধারিত সূচি (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) ছাড়া জরুরি ভিত্তিতে আবেদন জমা
পুলিশ ভেরিফিকেশন ও দ্রুত পাসপোর্ট সরবরাহ নিশ্চিতকরণ।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিষয়ে জানতে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল নুরুল আনোয়ারের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। লিখিত খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে প্রধান কার্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, বর্তমানে নরসিংদী, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, মৌলভীবাজার, লক্ষ্মীপুর, টাঙ্গাইল, চাঁদপুর, যশোর ও সাতক্ষীরাসহ বেশ কিছু আঞ্চলিক অফিসে কড়া নজরদারির কারণে ঘুস চ্যানেলগুলো অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে কিছু জায়গায় ঘুসের সুযোগ কমলেও সেবার মান উন্নত হয়নি; উল্টো দালাল ছাড়া সাধারণ নিয়মে আবেদনকারীদের ভোগান্তি বহুগুণ বেড়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গোড়ার পোস্টিং বাণিজ্য বন্ধ না করে কেবল মাঠ পর্যায়ে কড়াকড়ি করলে এই সংকট দূর হবে না।
পাসপোর্ট অফিসের এই লাগামহীন দুর্নীতি প্রতিরোধে ২০১৯ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। তৎকালীন সময়ে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের স্বীকারোক্তিমূলক অডিও ও ভিডিও রেকর্ডসহ একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই প্রতিবেদনে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ হিসেবে ২৫ জন কর্মকর্তার নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও বিশেষ তদবিরের কারণে অনেকের ব্যবস্থাপনাই থমকে যায়। এমনকি তালিকায় থাকা ৪ নম্বর অভিযুক্ত, উপপরিচালক বিপুল কুমার গোস্বামী (যিনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আমলে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে প্রশাসন শাখায় কর্মরত ছিলেন), তিনি দুদক থেকে দায়মুক্তির সনদ লাভ করেন। পরবর্তীতে গত ১২ মে তাকে পুনরায় ঘুসপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বদলি বা প্রাইজ পোস্টিং দেওয়া হয়, যা এই সিন্ডিকেটের স্থায়ী প্রভাবেরই একটি বাস্তব উদাহরণ।