খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (এসএসএমসি) মিটফোর্ড হাসপাতালের দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বকেয়া বেতন দ্রুত তোলার কথা বলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা কর্তৃক অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ এবং পরবর্তীতে উল্টো তিন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করার প্রতিবাদে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন ভুক্তভোগী কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত বেতন প্রদান, প্রশাসনিক হয়রানি এবং চাকরিচ্যুত করার ভয় দেখিয়ে সাধারণ কর্মচারীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল।
মঙ্গলবার (১৯ মে) দুপুরে হাসপাতালের পরিচালক কার্যালয়ের সামনে অর্ধশতাধিক দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী এই মানববন্ধনে অংশ নেন। মানববন্ধন শেষে ভুক্তভোগীরা হাসপাতালের পরিচালক বরাবর একটি লিখিত আবেদন জমা দেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কর্মচারীরা জানান, সম্প্রতি হাসপাতাল পরিচালক কার্যালয় থেকে জারি করা এক দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে তিন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। চাকরিচ্যুত হওয়া এই তিন কর্মী হলেন:
মো. ফজলুর রহমান (প্যাথলজি বিভাগ)
মো. আলাল হোসেন (অফিস সহায়ক)
মো. বিল্লাল মজুমদার (পরিচ্ছন্নতা কর্মী)
তারা প্রত্যেকেই দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতালে দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মচারীদের অভিযোগ, হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মো. জাহিদুর রহিম ডিডি অফিস ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাস করানোর খরচের কথা বলে কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন। ঈদের আগে দ্রুত বেতন পাওয়ার আশায় কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা সংগ্রহ করে তাকে প্রদান করেন। পরবর্তীতে এই অর্থ লেনদেনের বিষয়টি একটি মেসেঞ্জার গ্রুপে আলোচনা করা হলে, তার স্ক্রিনশট প্রশাসনের হাতে পৌঁছায়। এর জেরে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের ডেকে পাঠায় এবং আইডি কার্ড ও কাজে যোগদানের আশ্বাস দিয়েও পরদিন সকালে তাদের হাতে চাকরিচ্যুতির চিঠি ধরিয়ে দেয়।
মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি বিভাগের কর্মচারী আলী হোসেন এবং চাকরিচ্যুত কর্মী বিল্লাল হোসেন হাসপাতালের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের নানা তথ্য তুলে ধরেন। তাদের প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে হাসপাতালের মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের কর্মঘণ্টা, বেতন ও অন্যান্য বৈষম্যের চিত্র নিচে সারণিবদ্ধ করা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | তথ্যের বিবরণ ও কর্মচারীদের অভিযোগ |
| মোট ভুক্তভোগী কর্মচারী | প্রায় ১২০ জন দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মী। |
| বেতন বকেয়ার সময়কাল | কখনো ২ থেকে ৩ মাস, আবার কখনো ৫ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত। |
| দৈনিক মজুরির হার | দৈনিক ৮০০ টাকা (সরকারি নিয়ম অনুযায়ী)। |
| কাজের দিন বনাম বেতনের দিন | মাসে ৩০ দিন কাজ করানো হলেও বেতন দেওয়া হয় ২৬ দিনের। |
| অবৈধ অর্থ দাবির পরিমাণ | প্রথমে প্রতি কর্মচারীর নিকট ৫০০ টাকা দাবি, পরে সমঝোতায় ২০০ টাকা নির্ধারণ। |
| সংগৃহীত মোট অর্থের পরিমাণ | ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে কর্মচারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রায় ৩৬,০০০ টাকা। |
| অভিযুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা | মো. জাহিদুর রহিম (হাসপাতালের হিসাবরক্ষক)। |
মানববন্ধন শেষে হাসপাতালের পরিচালক বরাবর দেওয়া লিখিত আবেদনে কর্মচারীরা উল্লেখ করেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এই কর্মচারীদের অধিকাংশেরই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তারা নিজে। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে অনিয়মিত বেতনের কারণে তারা চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন।
আবেদনে কর্মচারীরা স্পষ্টভাবে জানান, তারা কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নন। হিসাবরক্ষক জাহিদুর রহিমের কথামতো দাপ্তরিক খরচ মেটাতে এবং দ্রুত বকেয়া বেতন পাওয়ার সরল বিশ্বাসেই তারা নিজেদের মধ্যে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার কোনো উদ্দেশ্য তাদের ছিল না।
কর্মচারীদের মূল দাবিসমূহ:
১. মানবিক বিবেচনায় তিন কর্মচারীর চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত অনতিবিলম্বে বাতিল করে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে।
২. বেতন দ্রুত ছাড় করার নামে অর্থ আদায়ের ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
৩. দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন জটিলতা স্থায়ীভাবে অবসান করতে হবে এবং ৩০ দিন কাজের বিপরীতে পূর্ণাঙ্গ মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কর্মচারীরা প্রশাসনের উদ্দেশ্যে আল্টিমেটাম দিয়ে ঘোষণা করেন, যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের এই যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া না হয়, তবে তারা পরবর্তীতে আরও কঠোর ও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবেন। একই সঙ্গে তারা এই অনিয়মের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে এনে সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।