বড় প্রকল্পে ঋণনির্ভর ব্যয় ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ বাড়ছে
খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে। মোট ১ হাজার ১০৫টি প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত এই বরাদ্দের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ অর্থ যাচ্ছে মাত্র পাঁচটি মেগা প্রকল্পে। এসব প্রকল্প হলো—রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ডিপিডিসি এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়ন। এই পাঁচ প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আগামী অর্থবছরে এ প্রকল্পের জন্য ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার বড় অংশ বৈদেশিক ঋণসহায়তার মাধ্যমে আসবে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ইতিমধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। জুন পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৬৮ দশমিক ২৮ শতাংশে। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে উচ্চ বরাদ্দ স্বাভাবিক হলেও এর সঙ্গে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সময়মতো প্রকল্প শেষ না হলে ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণের চাপ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৫ নর্দান রুট প্রকল্প। এতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। তবে সাত বছর পার হলেও প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। একই ধরনের ধীরগতির চিত্র দেখা যাচ্ছে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পেও, যেখানে ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও অগ্রগতি ১০ শতাংশের নিচে।
অবকাঠামো বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, নকশা পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ। তারা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে প্রকল্প ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে এবং ঋণনির্ভরতা বাড়বে।
তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প, যার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। সরকার এই প্রকল্পকে গভীর সমুদ্রবন্দর ও আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বন্দর নির্মাণ যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে সড়ক, রেল ও শিল্প সংযোগ নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ডিপিডিসি এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প। এ খাতে বরাদ্দ ৩ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। সরকারের লক্ষ্য রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, অবকাঠামো নির্ভর উন্নয়ন প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্পর্ক নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বড় ব্যয়ের প্রকল্পগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী এডিপিতে বৈদেশিক সহায়তানির্ভর প্রকল্পের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বড় অংশই বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাস্তবায়নে দেরি হলে সুদ ও ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত মান বাড়াতে এবার প্রকল্প বাছাই, বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চ ব্যয় ও ঋণনির্ভর এসব মেগা প্রকল্প সময়মতো ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা, যাতে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা যায়।