স্মরণে ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ

বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের ইতিহাসে যে ক’জন শিল্পী তাঁদের সৃজনশীলতা, নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দেশপ্রেমের দীপ্ত স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। তিনি শুধু একজন ভাস্কর ছিলেন না, ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালির আত্মমর্যাদার এক শিল্পিত ভাষ্যকার। তাঁর নির্মিত ভাস্কর্যগুলো বাংলাদেশের ইতিহাস, সংগ্রাম ও মানুষের চিরন্তন জীবনবোধকে ধারণ করে আজও প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
১৯৪৫ সালে সিলেট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী শিল্পী। শৈশব থেকেই শিল্পের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি ভর্তি হন তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসে, যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ নামে পরিচিত। ১৯৬৯ সালে তিনি চিত্রাঙ্কনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিত্রাঙ্কন ও ভাস্কর্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৭৪ সালে।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে শিল্পসাধনা ও জাতির ইতিহাসকে শিল্পে রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি ও বীরত্বকে শিল্পরূপ দিতে গিয়ে তিনি নির্মাণ করেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’। অপরাজেয় বাংলা শুধু একটি ভাস্কর্য নয়, এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সংগ্রাম ও প্রতিরোধের এক অবিনশ্বর প্রতীক।
১৯৭২ সালে ডাকসুর উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এই ভাস্কর্যের। সেই সময় তরুণ শিল্পী আবদুল্লাহ খালিদকে এর নির্মাণদায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ১৯৭৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং দীর্ঘ সাধনা ও নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
এই ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রতিচ্ছবি—যেখানে নারী ও পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। তাই ‘অপরাজেয় বাংলা’ কেবল শিল্প নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক চিরন্তন দলিল।
এছাড়াও তাঁর শিল্পকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের সামনে নির্মিত ম্যুরাল ‘আবহমান বাংলা’, বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সামনে স্থাপিত টেরাকোটার ভাস্কর্য এবং ‘অঙ্কুর’, ‘অঙ্গীকার’, ‘ডলফিন’, ‘মা ও শিশু’সহ বহু নন্দিত শিল্পকর্ম। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিতে ছিল দেশজ ঐতিহ্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ।
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ২০১৪ সালে লাভ করেন শিল্পকলা পদক। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক-এ ভূষিত করে।
দীর্ঘদিন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিল্পচর্চায় অনুপ্রাণিত করেছেন। শিল্পের প্রতি তাঁর নিবেদন ছিল আজীবনের।
২০১৭ সালের ২০ মে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই বরেণ্য শিল্পী পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর শিল্পদর্শন এবং তাঁর নির্মিত ভাস্কর্য আজও বাংলাদেশের মাটি, মানুষ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বহন করে চলেছে অবিচলভাবে।
শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি মহান এই শিল্পীকে।
তাঁর শিল্প বেঁচে থাকবে, যতদিন বেঁচে থাকবে বাংলাদেশ, তার ইতিহাস ও স্বাধীনতার চেতনা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।