বিশ্ব অর্থবাজারে মার্কিন ডলারের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এবং এটি গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে প্রায় সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান-সংক্রান্ত যুদ্ধ পরিস্থিতি, এবং যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি ঘিরে অনিশ্চয়তা—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার আবারও বাড়াতে হতে পারে। এই সম্ভাবনা ডলারের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে, কারণ উচ্চ সুদের পরিবেশ সাধারণত বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ডলারের দিকে আকৃষ্ট করে।
অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামও বাড়ছে। সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এতে বৈশ্বিক তেল বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব সরাসরি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর পড়ছে।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ইউরো, পাউন্ড, ইয়েনসহ প্রধান মুদ্রাগুলো ডলারের বিপরীতে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে জাপানি ইয়েনের দর আবারও কমে এমন পর্যায়ে নেমেছে, যা বাজারে সম্ভাব্য সরকারি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
প্রধান মুদ্রা ও জ্বালানির বর্তমান অবস্থা
উপাদান
বর্তমান মান
পরিবর্তন/অবস্থা
ডলার সূচক
৯৯.৩০৬
ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি
ইউরো
১.১৬০৮ ডলার
সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নমুখী
ব্রিটিশ পাউন্ড
১.৩৩৯৮ ডলার
ছয় সপ্তাহের নিম্নস্তরের কাছাকাছি
অস্ট্রেলীয় ডলার
০.৭০৯৭ ডলার
শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ কম
নিউজিল্যান্ড ডলার
০.৫৮২২ ডলার
শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ কম
ব্রেন্ট ক্রুড তেল
১১০.৮ ডলার/ব্যারেল
যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় বেশি
জাপানি ইয়েন
১ ডলারে প্রায় ১৫৯ ইয়েন
দুর্বল অবস্থায়
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ সুদের নীতি নিয়েও বাজারে জোরালো জল্পনা চলছে। বাজার অংশগ্রহণকারীদের ধারণা, চলতি বছরের শেষ নাগাদ সুদের হার আবার বাড়ানো হতে পারে। এই সম্ভাবনা ডলারের শক্ত অবস্থানকে আরও দৃঢ় করছে।
একদিকে সুদের হার বাড়ার প্রত্যাশা, অন্যদিকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা—এই দুই কারণে বিশ্ববাজারে বন্ড বিক্রির চাপও বেড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মুনাফার হার ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অর্থনৈতিক অস্থিরতার আরেকটি বড় ইঙ্গিত।
এছাড়া বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নীতিনির্ধারণী বৈঠকের কার্যবিবরণীর দিকে নজর রাখছেন। সেখানে ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতির দিকনির্দেশনা আরও কঠোর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ডলারের শক্তি আরও বাড়াতে পারে।
জাপানের মুদ্রাবাজারে ইয়েনের দুর্বলতা এতটাই বেড়েছে যে, এক ডলারের বিপরীতে এর মান ১৬০-এর কাছাকাছি চলে এসেছে। এই সীমা অতিক্রম করলে অতীতে জাপান সরকার একাধিকবার বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বিশেষ করে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও টাকার বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।