খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুল্ক ও কর আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি এবং প্রত্যাশিত বিদেশি বাজেট সহায়তা না আসায় তীব্র আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা, আগের নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধ, বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের ব্যয় নির্বাহের মতো বাধ্যতামূলক রাষ্ট্রীয় খরচ সচল রাখতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ, রাষ্ট্রের দৈনন্দিন ও অপরিহার্য ব্যয়ের অর্থ জোগাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে এবং ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই এই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে গেছে। অর্থবছরের জুলাই মাস থেকে শুরু করে গত ১০ মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঋণসংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের শুরুতে সরকারের মোট ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। পরবর্তী ১০ মাসের ব্যবধানে তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে মোট ৬ লাখ ৬০৪ শত ৭৩ কোটি টাকায়। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক—উভয় উৎস থেকেই সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের আয়ের প্রধানতম উৎস হলো অভ্যন্তরীণ রাজস্ব খাত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (এপ্রিল পর্যন্ত) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ঘাটতি। এই ১০ মাসে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রকৃত আদায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এই সময়ে রাজস্ব আদায়ে ১০.৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও অর্থবছর শেষ হওয়ার বাকি দিনগুলোতে মূল লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে হলে আরও ১ লাখ ৭৬… হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে, যা বাস্তবতার নিরিখে প্রায় অসম্ভব।
দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্থর গতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তথা আমদানি হ্রাস পাওয়ার কারণে রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ফলে বাজেটের বিশাল ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ঋণের ওপর ক্রমাগত নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৩ বিলিয়ন ডলারে। অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণ এভাবে বাড়তে থাকায় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সরকার যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এভাবে বড় অঙ্কের অর্থ তুলে নেয়, তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে এবং ঋণের সুদের হারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ঋণনির্ভরতা প্রসঙ্গে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর সাবেক চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন তাঁর সুনির্দিষ্ট মতামত প্রদান করেছেন। তিনি জানান, রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঐতিহাসিক ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে প্রত্যাশিত বিদেশি বাজেট সহায়তা সময়মতো না পাওয়ায় সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে এ ধরনের ঋণনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মোহাম্মদ নূরুল আমিনের বক্তব্য: “সরকার যদি সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে, তবে বাজারে নতুন টাকা সৃষ্টি করতে হয়। এটি সরাসরি মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায়। আবার সরকার যদি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তবে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগযোগ্য তারল্য কমে যায় এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বর্তমানে দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম থাকায় এই নেতিবাচক প্রভাবটি এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। তবে ভবিষ্যতে টেকসই অর্থনীতির স্বার্থে ব্যাংক ঋণনির্ভরতা কমানোর বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সরকারি ঋণ ক্রমাগত বাড়ার অর্থ হলো বার্ষিক সুদ পরিশোধের দায় ও পরিধি বেড়ে যাওয়া। এর ফলে প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের একটি বিশাল অংশ কেবল আগের ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। যদি এই ঋণ নিয়ে উৎপাদনশীল খাতে সঠিকভাবে ব্যয় করা না যায়, তবে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়বে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ঘাটতি দেখা দেবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তিনি সাধারণ সরকারি বন্ডের পাশাপাশি খাতভিত্তিক কিংবা মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বিশেষ বন্ড চালু করার পরামর্শ দেন। এর মাধ্যমে কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে তা আরও স্বচ্ছভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার এই প্রবণতা মূলত বৃদ্ধি পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছিল। এরপর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে দেশে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই সরকারকে দেশীয় ও বৈশ্বিক বহুমুখী অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের দেশীয় অর্থনীতিতেও। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি এবং বিদেশি অর্থায়নের এই ধীরগতির কারণেই সরকারের ব্যয় নির্বাহে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরে সরকার যে পরিমাণ ব্যাংকঋণ নিয়েছে, তার সিংহভাগ অর্থই এসেছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। সরকার মূলত ট্রেজারি বিল এবং দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করার মাধ্যমে এসব বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে। চলতি বছরের ১০ মে পর্যন্ত সরকারের নেওয়া ১ লাখ nine হাজার ৫৬৮ কোটি টাকার নিট ঋণের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি প্রদান করেছে মাত্র ৫ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ৪ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকার ঋণ একচেটিয়াভাবে সরবরাহ করেছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। অর্থাৎ, সরকারের বর্তমান ব্যাংকঋণের প্রায় সম্পূর্ণ অংশই এখন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।