খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ চলাকালে ডেনমার্কের তারকা ফুটবলার ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন হঠাৎ মাঠে লুটিয়ে পড়লে তার বুকে স্থাপন করা বিশেষ হৃদযন্ত্রের ডিভাইস ‘আইসিডি’ দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই আধুনিক প্রযুক্তির তাৎক্ষণিক কার্যকারিতার কারণে তিনি বড় ধরনের নিশ্চিত বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছেন। বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সি এই মিডফিল্ডার মাঠের ধাক্কা সামলে উঠে নিজের পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠছেন।
ক্রিস্টিয়ান এরিকসেনের হৃদযন্ত্র আজ থেকে পাঁচ বছর আগে (২০২১ সালে) একবার হঠাৎ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই গুরুতর ঘটনার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার শরীরে একটি আইসিডি (ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভারটার ডিফিব্রিলেটর) ডিভাইস বসানো হয়। সাম্প্রতিক ম্যাচে খেলার সময় আবারও তার হৃদযন্ত্রের ছন্দে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিলে এই ডিভাইসটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে এবং তাকে দ্রুত সুস্থ হতে সরাসরি সহায়তা করে।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বর্তমান পরিস্থিতি জানিয়ে এরিকসেন লিখেছেন, “আমার আইসিডি ঠিক যেভাবে কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সেভাবেই আমাকে প্রয়োজনের মুহূর্তে সুরক্ষা দিয়েছে।”
আইসিডি হলো মূলত ছোট আকারের ব্যাটারিচালিত একটি জীবনরক্ষাকারী ডিভাইস, যা হৃদযন্ত্রের ছন্দে কোনো বিপজ্জনক বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করলে সঙ্গে সঙ্গে তা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। চিকিৎসকদের মতে, এটি হৃদরোগের কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষামূলক চিকিৎসা ব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞদের বিশদ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এরিকসেনের ক্ষেত্রে ডিভাইসটি হৃদযন্ত্রের অস্বাভাবিক ও অত্যন্ত দ্রুত স্পন্দন (অ্যারিথমিয়া) শনাক্ত করার সাথে সাথে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বৈদ্যুতিক শক প্রদান করেছে। এর ফলে তার হৃদযন্ত্র আবার মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে। ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির স্পোর্টস কার্ডিওলজিস্ট অধ্যাপক অ্যানিল মালহোত্রা এই প্রক্রিয়াটির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “এটি অনেকটা হ্যাং হয়ে যাওয়া কম্পিউটার বন্ধ করে আবার নতুন করে চালু (রিবুট) করার মতো। আইসিডি অত্যন্ত কার্যকর একটি ডিভাইস।”
২০২১ সালে অনুষ্ঠিত ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের একটি ম্যাচ চলাকালে এরিকসেন হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়ে মাঠেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। সে সময় মাঠে উপস্থিত চিকিৎসকদের দ্রুত সিপিআর (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) এবং বহনযোগ্য ডিফিব্রিলেটরের নিখুঁত ব্যবহারের সাহায্যে তার হৃদযন্ত্র পুনরায় সচল করা হয়েছিল। চিকিৎসকরা স্পষ্ট মনে করেন, সেদিনের সেই তাৎক্ষণিক ও জরুরি চিকিৎসাই মূলত তার জীবন বাঁচিয়েছিল। পরবর্তীতে স্থায়ী সুরক্ষার জন্য তার শরীরে আইসিডি স্থাপন করা হয়, যা এবারের সাম্প্রতিক জটিলতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে।
ক্রীড়াঙ্গনে মাঠের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এরিকসেনের মতো বা তার আগেও বেশ কয়েকজন ফুটবলার এই ধরনের মারাত্মক শারীরিক জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন, যার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| খেলোয়াড়ের নাম | মাঠের ঘটনার বিবরণ ও ফলাফল | আইসিডি ব্যবহারের তথ্য |
| ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন | ২০২১ সালে ইউরো কাপে এবং সম্প্রতি মাঠে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হন। | শরীর আইসিডি ডিভাইস যুক্ত এবং সাম্প্রতিক ঘটনায় ডিভাইসটি তার প্রাণ বাঁচিয়েছে। |
| ফেব্রিস মুয়াম্বা | ম্যাচ চলাকালে মাঠে হঠাৎ তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং বেঁচে যান। | চিকিৎসাগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। |
| মার্ক ভিভিয়ান ফো | আন্তর্জাতিক ম্যাচ চলাকালে মাঠের মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হন। | তাৎক্ষণিক চিকিৎসা ও প্রযুক্তির অভাবে মাঠেই মৃত্যুবরণ করেন। |
চিকিৎসকদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হৃদযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক সংকেতের ত্রুটি, হৃদপেশির তীব্র প্রদাহ কিংবা হৃদযন্ত্রের জন্মগত বা গঠনগত সমস্যার কারণে মানুষের শরীরে এমন আকস্মিক ঘটনা ঘটতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণ বংশগত কারণে হয়, আবার কখনও কখনও শরীরে কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ বা নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও হতে পারে। তরুণ ক্রীড়াবিদদের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা বিরল হলেও এটি একেবারে অস্বাভাবিক নয়।
বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসকদের কঠোর নজরদারি ও পরামর্শ অনুযায়ী অনেক খেলোয়াড় আইসিডি নিয়েই পুনরায় পেশাদার খেলাধুলা ও অনুশীলনে ফিরতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা এখন খেলোয়াড়দের সঙ্গে এই প্রযুক্তির ঝুঁকি ও সুবিধা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
তবে এই সংক্রান্ত আইনি নিয়ম সব দেশে এক নয়। যেমন—ইতালির চিকিৎসা ও ক্রীড়া নীতি অনুযায়ী, শরীরে আইসিডি স্থাপন করা কোনো ফুটবলারকে অপেশাদার কিংবা পেশাদার কোনো পর্যায়েই ফুটবল খেলার অনুমতি দেওয়া হয় না। এরিকসেন ভবিষ্যতে পেশাদার ফুটবল চালিয়ে যাবেন কি না, তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। চিকিৎসকদের প্যানেল আগে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন যে, সাম্প্রতিক ম্যাচে তার হৃদযন্ত্রের ছন্দ কেন আকস্মিক বদলে গিয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে আর কী কী চিকিৎসাগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
যুক্তরাজ্যের একটি হৃদরোগ বিষয়ক দাতব্য সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি সপ্তাহে ৩৫ বছরের কম বয়সি প্রায় ১২ জন মানুষ আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে আগে থেকে শরীরে কোনো ধরনের দৃশ্যমান উপসর্গ বা পূর্বলক্ষণ দেখা যায় না।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে বলছেন যে, নিয়মিত উন্নত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে এই প্রাণঘাতী হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে পারে। ক্রিস্টিয়ানের এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি বিশ্ববাসীকে আরও একবার দেখিয়ে দিয়েছে যে, সঠিক সময়ে সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের জীবন বাঁচাতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।